সেরা ফুলচাষী

অমলেটটা নেতিয়ে গেছে | তিন পিস পাঁউরুটিও আর একটু পরেই নেতিয়ে পড়বে | চা-টা দেখে কেমন ফ্যাকাশে ড্রেনের জল মনে হচ্ছে | আমি আর পারবনা | অনেকদিন ভেবেছি এই লোকটাকে ছেড়ে চলে যাব | শুধু মনের টানে আটকে গেছি | ফালতু প্রেম হয়েছিল | মাস্টার্সে পড়ার সময় | লোকটা তখন নানারকম পরীক্ষা দিচ্ছে | দু-তিনটে চাকরি লাগিয়েও দিল | কিন্তু তার পোষালনা | বাড়িতে অনেক কষ্টে বিয়ের কথা বললাম | সে বিয়ে প্রায় হয়না আরকি | হবে কি করে? চাকরি পায় কিন্তু জয়েন করেনা | আরে তোর ট্যালেন্টের কাঁথায় আগুন | শেষে এই চাকরিটা নাকি তার ভাল লাগল | জয়েন করল, বিয়ে হল | তারপর থেকে ফুল, ফল আর শাক-সবজি নিয়ে ক্লাস করছি আর ঘর করছি | মোটামুটি আমার যা হাল তাতে নিজেই একটা ফার্ম হাউস খুলে বসতে পারি | এই রবিবারেও তিনি সকাল থেকে ব্যস্ত | ইউটিউব খুলে নানান দেশের গোলাপ চাষ দেখতে দেখতে ব্রেকফাস্টে ব্রেক লাগিয়ে ফেলেছেন | তুলে নিয়ে গেলাম সব | আর এসব ভাল লাগেনা | সাগ্নিক যখন কাজ করে তখন তাকে হ্যান্ডল করা খুব কঠিন কাজ | আর ঘুমনো ছাড়া সে প্রায় সবসমই কাজ করতে চায় | তবে বাড়ির কাজে যদিও অবহেলা নেই | এখন আবার স্পেশাল কাজ জুটেছে | দপ্তর থেকে কয়েকদিনের মধ্যে পুষ্প মেলা হবে | আর বাবু তাতেই ডুবে আছেন | সেরা ফুল চাষীকে নাকি পুরস্কার দেওয়া হবে |সার্টিফিকেটে লেখা থাকবে সেরা পুষ্প বন্ধু | হোক গে | আমার আর ওর সাথে থাকার ইচ্ছে নেই | এবার ওকে এটা বলার সময় এসেছে |

দুপুরে বাবু খেতে বসে ভাত মাখতে মাখতে বললেন, “বুঝলে রিঙ্কা, এবার মনে হচ্ছে হামেদ আলি পুরস্কার পাবে | দারুন গোলাপ ফুটিয়েছে |” আমি একটু “হমমম” বলে চুপ করলাম | আমার নামটা এখনও মনে আছে এই অনেক | ছোটপিসির দেওয়া আদরের নামটাই আমার ডাকনাম হয়ে গেছে | সাগ্নিক প্রথম প্রথম আসলটা ধরেই ডাকত | তারপর থেকে কঙ্কনা সবখানেই রিঙ্কা হয়ে গেছে | সাগ্নিক বলে ছিল, “আসলে কি জানো, কেঁচোসারটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট | ঠিকভাবে দিতে হবে | সে প্রিয়দর্শিনী, হ্যাপিনেস, সুপারস্টার, মন্টেজুমা যেকোন গোলাপেই তোমায় বুঝেশুনে কেঁচোসারটা দিতে হবে | নিমখোল বা সুফলা তো লাগবে সেটা আলাদা কথা | এই হামেদ লোকটা প্রিয়দর্শিনী ফোটায় |” আমিও কোনও কথা না বলে ওর চিকেনের বাটিতে আর এক পিস দিলাম | ব্রেকফাস্টের অভাবে হওয়া গর্তটা যদি লাঞ্চে একটু ভরে | আমি চলে গেলে এভাবে কেউ করবেনা |

কেঁচোসার, সুফলা, নিমখোল, এস.এস.পি, ইউরিয়া, মিউরিয়েট অফ পটাশ | এসব সার লাগে ফুল চাষ করতে গেলে | মানে তেমনটাই তো শুনে এসেছি | আমি বাসন মাজতে গেলে কি লাগে জানি, চিলি চিকেনে সয়া সস লাগে জানি, জ্বর হলে প্যারাসিটামল লাগে জানি | মানে হোম ডিপার্টমেন্ট চালাতে গেলে এগুলো তো জানতেই হয় | জুওলজিতে মাস্টার্স করে আরো অনেক কিছুই জেনে ছিলাম কিন্তু কি জানেন আমার না চাকরি করার ইচ্ছেটাই হয়নি কোনওদিন | সবাইকে বলছি এই ভুলটা করবেননা ভাই |আমার মত হাল হবে | তার মধ্যে কাজ-খ্যাপা বাউল টাইপ বর পেলে তো একদম ছড়িয়ে ছেষট্টি | অত সায়েন্টিস্ট প্যাটার্নের লোকের সাথে প্রেমও করবেননা | টোটাল ফাঁসবেন | দেখুন সন্ধে বেলাতেও মুড়ি আর ধনেপাতার পকোড়া খেতে খেতে বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে | খুব ইচ্ছে ছিল আজ সিনেমা দেখব | তো সে উপায় নেই | কাজ যেন আর কেউ করেনা | ও একাই করে | পুষ্প মেলার আর দুদিন বাকি | মাঝখান থেকে আমার কোনও কথা ওকে বলা হচ্ছেনা | খুব জরুরী কথাটাও | মেলাটা মিটুক | এভাবে হঠাৎ ধাক্কাটা দেওয়া ঠিক হবেনা |

মেলা জমে গেছে | হামেদ আলির গোলাপ | সন্তোষ রায়ের গাঁদা | আরও নানা জনের ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া আরও কত সব | আমি সত্যি ক্লিন বোল্ড | এত সুন্দর ফুল হয় ? কথা বেরোচ্ছেনা মুখ থেকে | বিভোর হয়ে দেখছি সাগ্নিককে | মেলা বসিয়েছে বটে একটা | হাব-ভাব দেখে মনে হচ্ছে বাবু রাজ্য জয় করেছেন | কত প্রশংসা | যে আসছে সেই হ্যান্ডশেক করে ভাল ভাল কথা বলে যাচ্ছে | স্টেজে উঠে আবার বক্তৃতাও দিয়ে এলেন | সন্তোষ রায় তিনরকম গাঁদা ফুটিয়েছে | ডিসকভারি, জুবিলী, ইনকা | ইনকার সাইজ আর রঙ দেখলে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় | সাগ্নিকের মুখে একটা অসম্ভব সুন্দর হাসি | সেই হাসিটা যেন আমায় আস্তে আস্তে পুরো অধিকার করে নিচ্ছে | খ্যাপামির জন্যে রাগ করি আর যাই করি আমি তো জানি ও কতটা খেটেছে | কত পড়াশোনা করে দিনরাত ফুলচাষীদের হেল্প করার জন্য | যাতে তারা ফুল ফোটাতে পারে আরও ভালভাবে | যাতে তারা একটু সুখের, একটু শান্তির মুখ দেখে | ও এখন এই সাফল্যটা পুরো এনজয় করে নিক | আজ রাতে যে করেই হোক ওকে কথাটা বলতে হবে | আজকেই বেস্ট টাইম |

রাতে শুয়ে বেশ রিল্যাক্সড মনে হল সাগ্নিককে | আমায় জিজ্ঞেস করল, “মেলাটা ভাল লেগেছে রিঙ্কা ?” আমি আর কি বলি | সব ভাললাগা কি কথায় বোঝানো যায় | মাথাটা টেনে নিয়ে কপালে একটা হামি দিলাম | এবার নিশ্চয়ই বুঝেছে | পরক্ষনেই সে নিজের মূর্তি ধরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কি মনে হচ্ছে ? হামেদ আলি না সন্তোষ রায় ? সেরা পুষ্প বন্ধু কে ?” আমি দেখলাম এই সুযোগ | বললাম, “সাগ্নিক মুখার্জী |” সাগ্নিক হা হা করে হেসে বলল, “আমি কবে ফুল ফোটালাম? কোথায়? ” আমি ওর হাতটা নিয়ে আমার পেটে রাখলাম | বললাম “এখানে | তোমার ফুল | তবে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, গাঁদা, জবা, জিনিয়া নয় | এ ফুল অন্য্ ফুল |” সাগ্নিক একবার অবাক হয়ে আমায় দেখল, তারপর সেই অসম্ভব সুন্দর হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল আমার একান্ত ব্যক্তিগত ফুলচাষীর মুখে |

Advertisements

বাসন্তী কালিম্পঙ

শীত কমতে কমতে যখন প্রায় শেষ হয়ে যাবে যাবে, ঠিক তখনই পলাশ আর শিমুল ফোটে | খয়েরি ডালে ডালে লাল বা হলুদ ফুল | গাছের নীচে স্তুপ হয়ে যাওয়া পাঁপড়ির শরীর | শন শন হাওয়া বুঝিয়ে দেয় এই সেই বসন্ত | সজনে গাছগুলো হলুদ ফুলে ভরে যায় | আমের ডালে মুকুল আসে আর মধুর লোভে আসে মৌমাছি | এমন এক দিনে বেলা-বেলি চড়ে বসলুম গাড়িতে | সেবক রোড ধরলে শিলিগুড়ি থেকে সেবক মাত্র ২২ কিলোমিটার | সেবকেশ্বরী কালীমাতাকে প্রণাম ঠুকে, বিখ্যাত বাঘপুল মানে করোনেশন ব্রিজকে ডানদিকে রেখে এগোলাম সামনে | নীচে গাছের ফাঁক থেকে উঁকি দিতে দিতে সঙ্গ নিল তিস্তা | সবজে জলের ধারা | মাঝে মাঝে পাথরের গা ভিজিয়ে কেমন ফুর্তিতে চলেছে | এগোতে এগোতে একসময় পেরিয়ে গেলাম তিস্তা ব্রিজ | তারপর মাইলস্টোনগুলো গুনতে গুনতে আর সবুজ পাহাড়ের আদর খেতে খেতে আমার গাড়ি উঠতে লাগল উপরে,.আরও উপরে | পাকদন্ডীতে পাক খাচ্ছি আর নীচে তিস্তার চরে লাল হয়ে আছে বিরাট বিরাট শিমুল গাছ | দিনটাও সরস্বতী পুজোর আগের দিন | পলাশপ্রিয়ার উৎসবে এগিয়ে চলেছি ফুলের শহর কালিম্পঙের দিকে |
 
কালিম্পঙ পৌঁছতে প্রায় বেলা তিনটে বেজে গেল | মোটর স্ট্যান্ডের কাছে হোটেল ঠিক করে মালপত্র রেখে বেরতেই বুঝতে পারলাম বেশ খিদে পেয়ে গেছে | কাছেই একটা ছোট দোকানে আরাম করে ভেজ মোমো খেয়ে নিলাম | দারুন মোমো | দোকানি দিদির ব্যবহারটিও বেশ | সেদিন বিকেল আর সন্ধে মোটামুটি শহরে হেঁটেই কেটে গেল | টেনথ মাইলের দিকে একটা ভালো কফির দোকান পেলাম | খুব ভালো কফি | এই অঞ্চলের প্রথমে নাম ছিল ডালিমকোট | পরে নামটা পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় কালিবং | তারপর কালিবং যে কখন আস্তে আস্তে কালিম্পঙ হয়ে গেছে সেটা বলা মুশকিল | বহুকাল আগে কালিম্পঙ পর্যায়ক্রমে সিকিম ও ভুটানের অধীন ছিল | পরে ব্রিটিশের হাতে আসে | ব্রিটিশ-বঙ্গে কালিম্পঙ অন্যতম হিল-স্টেশন হিসেবে প্রখ্যাতি লাভ করে | পরবর্তীকালে পশ্চিম-বঙ্গের অন্তর্গত হয় কালিম্পঙ | আয়তনে বাড়তে থাকে শহর | আজ ডেলোর জলাধার, বেশ কয়েকটি চার্চ ও মন্দির, একটি মসজিদ, মোটর স্ট্যান্ড, স্টেডিয়াম ইত্যাদি নিয়ে কালিম্পঙ বেশ একটা গুছিয়ে বসা শৈলাবাস |পর্যটনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন এই শহর | এখন তো নিজেই জেলা হয়ে গেছে | একদিকে দার্জিলিং ও অন্যদিকে লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ | আবার তারই সাথে পেডং পেরিয়ে সিলারি হয়ে পথ গিয়েছে জুলুক | সেই ঐতিহাসিক রেশমপথ | রেশমের কারবার চলত এই বিখ্যাত পথে |
 
পরদিন সকালবেলায় একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সারা এলাকা ঘুরে দেখতে | ভ্রমণ শুরু হল গল্ফ কোর্স থেকে | সবুজ কার্পেটের মত মসৃন গল্ফ কোর্স | অসাধারন সুন্দর | ছড়ানো-ছিটানো | সেনাবাহিনীর বানানো জিনিস | কাজের অবসরে গল্ফ খেলো | খেলার অবসরে কফি বা চায়ে চুমুক দাও | একটু দূরেই মরগ্যান হাউস | বিখ্যাত বাংলো | এখন আমাদের রাজ্য পর্যটনের অতিথি নিবাস | পুরনো ঐতিহ্যের গন্ধে ভরপুর বাড়ি | দেখলেই ছবিতে দেখা ইংল্যান্ডের কথা মনে পড়ে | অনেক ফুল দিয়ে সাজানো বাংলোর লন | বসন্তের ফুলের মন-মাতানো সংকলন | আমার গাড়ি আবার এগিয়ে চলল | ভারতীয় সেনা দপ্তর পেরিয়ে সোজা চলে এলাম জং ডগ পালরি ফোব্রং গুম্ফায় | ১৯৩৭ সালে তৈরী এই গুম্ফার ডাকনাম দুরপিন মনাস্ট্রি | দুরপিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুম্ফা কারন এখানে দলাই লামার উপহার দেওয়া ১০৮ খন্ডের কাঞ্জুর গ্রন্থটি রয়েছে | তিনতলা মনাস্ট্রির একদম উপরে উঠলে কালিম্পঙ শহর আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় | যদিও আমার এই যাত্রায় কাঞ্চনদেবী দেখা দেননি | কুয়াশার একটু বেশি রকম আধিক্য ছিল |
 
দুরপিন থেকে আমার গাড়ি চলে এল চিত্রভানুতে | প্রচুর ফুল গাছে ভরা এই অসাধারণ কটেজটিতে রবি ঠাকুর এসে থাকতেন মাঝে মাঝে | বাড়িটি এখন নানা রকম কলার প্রশিক্ষন কেন্দ্র হয়ে গেছে | ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষেধ | পালসে পেন ভিউ নার্সারি | কালিম্পঙের সবচেয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধ নার্সারি এটি | পেন ভিউ এর ক্যাকটাস সত্যিই দেখবার মত | এখান থেকে গাছের চারা কেনা যায় | কালিম্পঙ এমনিতেই ফুলের শহর, নার্সারির শহর | পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ফুল যায় এখান থেকে | বসন্তে তাই এই নার্সারি গুলো মোহময়ী হয়ে ওঠে | রাস্তায় ফুল, পাহাড়ের গায়ে ফুল, বাড়িগুলোর রেলিঙে ফুলে ভরা গাছ | অজস্র অর্কিডের গাছ দেখা যায় বিভিন্ন নার্সারিতে | চলতে চলতে সরস্বতী পুজোর অঞ্জলির শব্দ কানে আসছিলো | কপাল গুনে পরের দিন আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে | বসন্তে কালিম্পঙ একেবারে বাসন্তী |
 
এবার এগোলাম হনুমান টকের দিকে | পাহাড়ের উপর বিরাট বজরংবলীজির মন্দির | মূর্তির শিল্প সুষমা অসাধারণ | পাশে দূর্গা মন্দির, গনেশ মন্দির ও শিব মন্দির দেখা হল | পাহাড়ের গায়ে বানানো এই মন্দিরগুলো কালিম্পঙের অবশ্য দ্রষ্টব্য | এবার চলে এলাম গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তিতে | অসম্ভব সুন্দর মূর্তিটি | গৌতমবুদ্ধের প্রিয় গুরু পদ্মসম্ভবের স্থান | অদ্ভুত ব্যাপার হল যে বাংলা থেকে এক বাঙালি পুরুষ তিব্বতে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে | তখন তিব্বত বৌদ্ধ ধর্মের মূল প্রাণকেন্দ্র ছিলনা | তিনি ধর্মপ্রচারে এতটাই সফল হন যে পরবর্তীকালে অনেক বৌদ্ধ খানকে আর ফ্রেস্কোতে বুদ্ধদেব ও পদ্মসম্ভবের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মগুরুদের মুখের আদলে তাঁর মুখের মিল পাওয়া যায় | তিনি শ্রী অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান | এখনকার বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের এক বাঙালি বৌদ্ধ | পদ্মসম্ভবের মূর্তিটা দেখে এই কথাটা মনে পড়ে গেল | বড় গর্ব হল বাঙালিদের জন্য | তথাগতের ভাবনাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি | বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী তথাগত বারবার ফিরে আসেন এই পৃথিবীতে | জাতিস্মর থেকে জাতিস্মরে ছড়িয়ে যেতে যেতে তথাগত একটা গোটা জাতির স্বর হয়ে গেছেন |
 
উত্তর সিকিমের চোলামু হ্রদ থেকে বেরিয়েছে ত্রিস্রোতা বা তিস্তা | কালিম্পঙের কাছে রেলি, রিয়াং ও নানা রকম খোলা এসে মিশেছে তিস্তায় | তিস্তাবাজারের কাছে এসে মিশেছে রঙ্গীত | ডেলোর দিকে উঠতে উঠতে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল একটা ভিউ পয়েন্টে | এখন থেকে তিস্তা আর রেলিখোলার মিলন দেখা যায় | তিস্তা এমনিতেই বড় সুন্দরী | সাথে রেলি এসে মিশলে ব্যাপারটা আরও রোম্যান্টিক হয়ে যায় | ভিউ পয়েন্টের উপরে উঠে দেখলাম দারুন সুন্দর একটা যীশুর ক্রস | তার নীচে দুই প্রেমী | কলকলানো হাসি | তিস্তা-রেলির মিলনের মতই সুন্দর | ভিউ পয়েন্ট থেকে সামনে এগোতে এগোতে আকাশে রং-বাহারি পাখির মত কিছু জিনিস চোখে পড়ল | ভাল করে দেখে বুঝলাম প্যারা-গ্লাইডিং হচ্ছে | ছাতার মত পাল লাগানো গ্লাইডার | তাতে কেউ একা বা দোকা ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে | ডেলোর গেটের বাইরে বেশ কিছু সংস্থা অফিস খুলে বসে আছে প্যারা-গ্লাইডিংয়ের জন্যে | একা করলে একা | চাইলে সাথে ট্রেনার | সঙ্গে পুরো ব্যাপারটার ভিডিও | প্রায় ২০-৩০ মিনিট | হাঁটতে হাঁটতে ডেলোর বাংলোয় উঠে এলাম | চমৎকার সাজানো পরিবেশ | ফুলে ভরা বাগিচা | এখানে একটা জলাধার আছে | ডেলো কালিম্পঙের সবচেয়ে উঁচু জায়গা | চাইলে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায় বাংলোর লনে |
 
এরপর নামতে নামতে গ্রাহামস হোমের রাস্তা ধরলাম | স্কটিশ সাহেব ডক্টর জেমস এন্ডারসন গ্রাহাম কালিম্পঙ পাহাড়ে এসে একটা হোম বানান | এখানে বাচ্চাদের স্কুল আছে | পড়াশোনা ছাড়াও নানারকম হাতের কাজের ট্রেনিং দেওয়া হয় | ১৯৩০ সালে তৈরি এই গ্রাহামস হোম | মন ভালো করা জায়গা | শুনেছি ডক্টর গ্রাহামসের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হত কালিম্পঙ এসে | মোটরস্ট্যান্ডে ফিরে দুপুরের খাওয়াটা সেরে ফেললাম | বলে রাখা দরকার স্ট্যান্ডের ঠিক উল্টো দিকে মিতজু হোটেল আর মেন রোড থেকে ডানদিকে এগিয়ে লি’জ-এ খাওয়াটা জরুরী | মেন রোডের ঘড়ি মোড়ের পাশেই গমপু’জ বার ও রেস্তোরাঁ | কালিম্পঙের সবথেকে পুরনো খানা-পিনার থেকে | মিতজু আর লি’জ-এ অসাধারন চিকেন ফ্রায়েড রাইস বানায় |
 
দুপুরের পর চললাম স্হানীয় হাট-বাজারে | খুব প্রসিদ্ধ এই কালিম্পঙের রাজা দোর্জে হাট | নানারকম পণ্যের প্রদর্শন ও বিক্রি | ফল থেকে ব্যাগ পর্যন্ত | দোকানিরা নিজেদের পরিবারের লোকজনদের নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন | কালিম্পঙ ভ্রমণে এই হাট-বাজার অবশ্যই ঘুরে যাওয়া উচিত | স্হানীয় পসরার স্বাদ পাওয়া যায় আর আলাপ হয় স্হানীয় মানুষ-জনের সাথে | সন্ধেটা কেটে গেল বিভিন্ন প্রাচীন জিনিসের দোকানগুলোতে | এই কিউরিও শপগুলোতে নানারকম থ্যাংক, ফটোগ্রাফ, ধাতুর মূর্তি ইত্যাদি পাওয়া যায় | ছোট চোর্তেন ও তিব্বতি বাদ্যযন্ত্র পর্যন্ত মেলে | মেন রোডের রেনু প্রধানের দোকান থেকে স্হানীয় আচার কিনলাম | কচি বাঁশের আচার |
 
পরদিন ছিল রবিবার | মোটর-স্ট্যান্ড থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম | একটু এগিয়ে পাহাড়ি পথ উঠে গেছে উপরে | আমিও উঠতে থাকলাম | গন্তব্য ম্যাকফারলেন চার্চ | পুরনো ও বিখ্যাত এই চার্চ রেভারেন্ড ম্যাকফারলেনের তৈরি | স্হাপত্য শিল্পের বিচারে অতুলনীয় | রবিবার সকালের মাস-এ খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম | বড় ভাল লাগল |
 
কিছুক্ষন পরে যখন শিলিগুড়ির বাস ধরে নামছি তখন মাথার মধ্যে সবকিছু কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে | ব্রিটিশ, রবীন্দ্রনাথ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, পুরনো বাংলো, প্যারা-গ্লাইডিং আর নানারকমের মরশুমি ফুলের এই শহরে আগে একবার এসেছিলাম | সেই টানে আবার এলাম | বাস পাকদন্ডী বেয়ে নামতে নামতে মন আপনা থেকেই বলে উঠল, আমি আবার আসব কালিম্পঙ, তুমি এমনই থেকো | আমি আবার আসব |
IMG_4733_FotorIMG_4744_FotorIMG_4750_FotorIMG_4752_FotorIMG_4772_FotorIMG_4786_FotorIMG_4789_FotorIMG_4793_FotorIMG_4801_FotorIMG_4803_FotorIMG_4833_FotorIMG_4847_FotorIMG_4868_FotorIMG_4874_FotorIMG_4882_FotorIMG_4893_FotorIMG_4895_FotorIMG_4910_FotorIMG_4917_FotorIMG_4929_FotorIMG_4944_FotorIMG_4953_FotorIMG_4959_FotorIMG_4966_FotorIMG_4975_FotorIMG_4976_FotorIMG_4982_FotorIMG_5010_FotorIMG_5013_FotorIMG_5035_FotorIMG_5052_FotorIMG_5075_Fotor

গ্যাংটকে গ্যাং-ট্রিপ

অক্টোবরে গ্যাংটক ঘুরে এলাম | শিলিগুড়ি থেকে শেয়ারের গাড়িতে ২৫০ টাকা নিল | একেবারে দেওরালি স্ট্যান্ডে ছেড়ে দিল | সেখান থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে (২০০ টাকা ) সোজা এম জি মার্গ | হোটেল বুক করা ছিল ফোন করে | অন্নপূর্ণা | ১২০০ টাকায় ট্রিপল বেড | আমাদের ইচ্ছেমত ৪ তলায় একটা ঘর নেওয়া হল | যাতে উপর থেকে সব দেখা যায় | খুব ভালো ঘর | খাওয়া-দাওয়া পাশেই বাবুমশাইতে | খুব ভালো খাবার | তবে একটু যেন দাম বেশি | খেয়ে নিয়ে সোজা রোপওয়ে | কলকাতার এক কোম্পানির বানানো এই গ্যাংটক রোপওয়ে | দুর্দান্ত ভিউ | পুরো গ্যাংটক আপনার হাতের মুঠোয় | সন্ধে বেলা সিটি ওয়াক |
পরের দিন ভোরবেলা কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব অল্প সময়ের জন্য একটু দেখা গেছিলো | তাও পুরোটা নয় | গাড়ি ঠিক করা ছিল | নাথুলার পারমিট না পাওয়ায় বাবা মন্দির অবধি | ওয়াগন আর | ফুল ট্রিপ ২৫০০ টাকা | এটা শেয়ারে মোটামুটি ৭০০ পড়ে | আমরা চেয়েছিলাম মাঝে মাঝে নামব | ছবি তুলব | সংমো লেক মানে যাকে বলে ছাঙ্গু লেক, সেরাথাং লেক আর বাবা মন্দির দেখে ফিরে এলাম | বিকেলে চলে গেলাম এনচে মনাস্ট্রি | ট্যাক্সিতে ১০০ টাকা |সন্ধে বেলা জোরদার শপিং হল লাল বাজারে | প্রচুর দোকান | নানারকম জিনিস পাবেন আপনি | বাজার থেকে নেমে রাস্তায় ওঠার সিঁড়িতেও অনেক দোকান | আশ মিটিয়ে শপিং করা যাবে |
পরের দিন সকালে ১০০০ টাকা দিয়ে একটা ট্যাক্সি বুক করলাম | রুমটেক ঘোরার জন্যে | রুমটেক খুব বিখ্যাত মনাস্ট্রি | গ্যাংটক এলে সবারই যাওয়া উচিত | প্রায় বারোটা নাগাদ ফিরে হোটেল থেকে চেক-আউট করে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে শিলিগুড়ির বাস ধরলাম |
আমার হাতে খুব বেশি সময় ছিলনা | আপনারা যারা সময় নিয়ে যাবেন তারা গ্যাংটকে থেকে লোকাল সাইট-সিইংটা অবশ্যই করবেন | তাশি ভিউ পয়েন্ট, বনঝাকড়ি ফলস, হনুমান টক, গনেশ টক ইত্যাদি ইত্যাদি | মাথাপিছু ৩০০-৪০০ পড়তে পারে |
পরিষ্কার-পরিছন্নতার জন্য কেন সিকিম আজ একনম্বরে উঠে এসেছে সেটা এই শহর দেখলে আপনি বুঝতে পারবেন | ভাবনা-চিন্তা এতটাই এগিয়ে যে শহরের মধ্যে সিগারেট পর্যন্ত খাওয়া যায়না | তার জন্যে আলাদা স্মোকিং জোন করা আছে | ঘুরে আসুন | ভাল লাগবে |

IMG_6689_FotorIMG_6755_FotorIMG_6692_FotorIMG_6778_FotorIMG_6753_FotorIMG_6709_FotorIMG_6777_FotorIMG_6822_FotorIMG_6840_FotorIMG_6704_FotorIMG_6797_FotorIMG_6847_Fotor

রুমটেক

রাতে ঠিক হয়েছিল যে ভোরবেলা ব্যালকনি থেকে যদি আকাশের কোণে সোনালি রঙের রাংতাটা দেখা যায় তো চট করে হোটেলের নীচ থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা তাশি ভিউ পয়েন্টে চলে যাবো | কারণ ওটাই আমাদের গ্যাংটকে শেষ দিন | যদি কাঞ্চনের একটু ভালো ছবি আসে | ভোরবেলা কিন্তু কাঞ্চন মেঘ সরিয়ে সামনে এলনা | ফলে আমরা সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়ে যেখানে এম.জি.মার্গের সাথে টিবেট রোড এসে মিশেছে সেখানে পৌঁছে একটা বিহারী দোকানে পুরি-তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট খেলাম | তারপর একটু হেঁটে এসে একটা ট্যাক্সিতে উঠে এগোলাম রুমটেকের দিকে | আমার ছোটবেলার গ্যাংটক ভ্রমনের সময় এক বিকেলে রুমটেক গেছিলাম | এবার সময়ের এত অভাব ছিল যে রুমটেক প্রায় যাওয়া হয়না আর কি | বারোটায় হোটেল ছাড়তে হবে | ট্যাক্সি আমাদের নিয়ে সাড়ে দশটায় নীচে নামতে শুরু করল |

দেওরালি পেরিয়ে ট্যাডং হয়ে নেমে একসময় ডানদিকের রাস্তা ধরলাম | রুমটেক একেবারে অন্য একটা পাহাড়ে, রাস্তা বেশ খারাপ | গাড়ি জোরে চলায় আমরা ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোচ্ছি | ঝাঁকুনি খেতে খেতেই পৌঁছে গেলাম রুমটেকের গেটে | রুমটেক মনাস্ট্রি | কগয়ু বৌদ্ধদের ইন্টারন্যাশনাল হেড কোয়ার্টার | গেটে ভোটার আই ডি কার্ড দেখিয়ে কয়েক মিনিটের খাড়াই উঠে মনাস্ট্রি | খাড়াই বেয়ে যত ওপরে উঠছিলাম তত গম্ভীর গলায় তিব্বতি মন্ত্রোচ্চারণ কানে ভেসে আসছিল | আজ কোনও একটা বড় কনভেনশন আছে | রুমটেকে দেশ-বিদেশ থেকে অতিথিরা আসেন, পর্য্টকরা আসেন , বৌদ্ধদের সভা-টভা বসে, কখনও লামা ড্যান্স হয় | রায়বাবুর গ্যাংটকে গন্ডগোল যারা পড়েছে এসব তারা জানে | তো সেদিনও এরকম একটা সভা ছিল | স্তোত্রপাঠ হচ্ছিল |

আমরা আস্তে আস্তে গোল্ডেন স্তুপে গিয়ে ঢুকলাম | আমাদের সাথে সাথে ঢুকল ভূটান থেকে আসা একদল কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে | সুন্দর সুন্দর ভূটানি ট্র্যাডিশনালস পড়া | তারপর সবাই মিলে প্রণাম শুরু করল ষোড়শ কর্মপা রনজং রিগপে দোরজির স্মৃতিতে | আমরাও করলাম | তারপর বেরিয়ে এলাম |গোল্ডেন স্তুপের সামনেই লামাদের থাকার জন্যে একটা খুব সুন্দর বাড়ি আছে | সেখানে বেশ ছবি-টবি তুলে নীচে চলে এলাম | স্তুপের ভেতরে ছবি তোলা বারণ | দুজন লামাকে অনুরোধ করে আমিও তাদের সঙ্গে নিজের একটা ছবি তুলে নিলাম | তারপর চললাম ধর্মচক্র সেন্টারে | এতক্ষনে স্তোত্রপাঠ থেমেছে, সভা ভেঙে গেছে | মানুষজন মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছে | আমরা ঢুকে পড়লাম | সারি সারি গালিচা পাতা | সেখানে কিছু লোক তখনও বসে আছে | এখানেও ছবি তোলা বারণ |

রুমটেক কেন বারবার হাত ছড়িয়ে ডাকে সেটা এই মন্দিরে এলে বোঝা যায় | অপার শান্তি প্রত্যেকটা কোণায় | জীবনে নানাভাবে জর্জরিত মানুষের অন্যতম শান্তির আশ্রয় রুমটেক | আমার তো তেমনটাই মনে হয় | সেদিন যদিও ভীড় ছিল | ফাঁকা থাকলে শান্তিটা আরো বেশি ফিল করা যেত | বাইরে বেরিয়ে অনেক ছবি তুললাম | তারপর উৎরাই পথ ধরে নামতে নামতে একটা দোকানে তিব্বতি ধুপ কিনলাম | এই ধুপটা আমার খুব পছন্দের | গেট পেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম | কিছুক্ষন পরে ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো একটা চায়ের দোকানে | সেই দোকানের পাশে একটা খুব সুন্দর ভিউ-পয়েন্ট বানানো আছে | উল্টোদিকের গ্যাংটক তো বটেই একেবারে সংমো লেকের এরিয়াটাও দেখা যায় | অসাধারণ ভাল ছবি এল | তারপর  চা খেয়ে নিয়ে যখন হোটেলে ফিরলাম তখন পৌনে-বারোটা বাজে | এবার শিলিগুড়ি নামতে হবে |

এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাটা পড়ে যদি তোমার একটুও ভাল লাগে তবে আমার অনেকটা ভাল লাগবে | লেখাটা একটু রায়বাবুর মত হয়ে গেল | আমিও তো রায় | এটা সেই প্রবাদ-প্রতিম এস. রায়কে একটা ছোট্ট শ্রদ্ধাঞ্জলি, এই নগন্য এস. রায়ের দেওয়া |

IMG_6826_FotorIMG_6819_FotorIMG_6811_FotorIMG_6830_FotorIMG_6838_FotorIMG_6840_FotorIMG_6845_FotorIMG_6849_FotorIMG_6852_Fotor

 

ইস্পাত নগরী

বর্ধমান ছাড়ার পরে জানলার বাইরেটা দেখতে দেখতে মনটা কেমন চুপ করে গেছিল | ট্রেনটার স্পিড কমার সাথে সাথে সেটা আবার জেগে উঠছিল একটু একটু করে | খুব জোরে ট্রেন চললে বাইরে উল্টো-ছোটা দুনিয়াটা আমায় চিরকাল একটা ঘোরলাগা ভুতুড়ে অবস্থার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে | এবার আমি আস্তে আস্তে আবার ট্রেনের মধ্যে ফিরতে থাকলাম | কানের কাছে  জোরালো গলায় “মশলা মুড়ি ” বলে একটা আওয়াজ এই ঘোরটা পুরোপুরি কাটাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল | টিনের বাক্সতে ঠনঠন আওয়াজ, বড় চামচ দিয়ে স্টিলের কৌটোর মধ্যে অভ্যস্ত হাতে মুড়ি মাখার শব্দ, আচারের গন্ধ, ঠোঙায় ভরা মুড়ির ওপর নারকেল ফালি দিয়ে ট্রেনসুলভ গার্নিশিং | এমনিতেই হাতটা বুক পকেটে চলে গেল | টাকা বের করলাম | দু-মিনিট পরে যখন বাঁহাতে ঠোঙা নিয়ে ডানহাতে নারকেলে কামড় মারলাম তখনই ট্রেনটা একটা হ্যাঁচকা মেরে স্টেশনে দাঁড়ালো | খানা জংশন | এবার ট্রেন ঠিক লাইন ধরবে | আসলি খেল শুরু হবে এবার | আমি চলেছি আমার ছোটবেলায় | দুর্গাপুর | তবে আমার এই জার্নিটা কিন্তু আজ লিখতে বসিনি | আজ লিখতে বসেছি বেশ কিছু পুরোনো কথা | যে কথাগুলো আমি জানি আর অন্য কয়েকজন জানে | আর জানে এই রেললাইনটা |

উত্তর প্রদেশের কানপুরের এক প্রবাসী বাঙালি পরিবার | গৃহকর্তা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির ইঞ্জিনিয়ার | বদলির চাকরি | তবে কানপুরে অনেকদিন থাকতে হয়েছিল | আর্মাপুরে কর্মক্ষেত্র ও কোয়ার্টার | প্রবাসী বাঙালি ক্লাবের দুর্গাপুজো, ফাংশান, নাটকে অভিনয়, গ্রীন পার্কে ক্রিকেট সব মিলিয়ে বড় সাইজের পরিবারটার জমজমাট ব্যাপার | কানপুরে থাকতে থাকতেই বড় মেয়ের বিয়ে | সোজা হাওড়ার বেলুড়ে | তারপর পরিবারটা চলে এল দুর্গাপুরে | এই ট্রান্সফারটা হঠাৎ করেই বড় মেয়ের বাপের বাড়ির কনসেপ্টটাই বিলকুল বদলে দিয়েছিল | তারপর থেকে দুর্গাপুরের কোয়ার্টারই আমার দিদানের বাপের বাড়ি হয়ে ওঠে | প্রথমে নিউটন এভিনিউ, তারপর ভারতী | আমি কিন্তু দিদানের বাপের বাড়ি বা আমার মায়ের মামাবাড়ি বলতে ভারতীর সেই কোয়ার্টারটাই বুঝি | নিউটন-এর আগের কোয়ার্টারটায় পুরো ফ্যামিলি যখন থাকত তখন আমার জ্ঞান হয়নি | পরে দেখেছি সেটা |

স্বাধীনতার পরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে দুর্গাপুর | স্টিল তৈরী করার জন্যে | দেশের নানা প্রান্ত থেকে নানারকম কারিগরি লোকজন এসে জোটেন | একটা ব্লেনডেড সোসাইটি তৈরী হয় | চারতলা কোয়ার্টারের দো-তলায় ইডলি তৈরী হলে সেটা একতলায় আসতো | তেমনই একতলার ভাজা শুক্ত দোতলায় যেত | শিল্প অভিমুখে দৌড়তে থাকা দুর্গাপুর নিজেকে এভাবেই  কসমো বানিয়ে নিয়েছিল সেদিন | এই প্রসেসটা যখন বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একটা স্বতন্ত্র দুর্গাপুর তৈরী হয়েছে তখন থেকে আমি দুর্গাপুরে যাচ্ছি আর আসছি |

আজ পানাগড়েও বাইপাস হয়েছে | তখন শুধু জি টি রোড ছিল | গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড | শের শাহ সুরী সেই কবে তৈরী করেছিলেন | নাম দিয়েছিলেন সড়ক-এ-আজম | মূলতঃ হর্স পোস্ট মানে ঘোড়ার মাধ্যমে চিঠি-পত্র সাপ্লাইয়ের জন্য | ঘোড়ার ডাকের প্রচলন হয় | তার আগে ঘোড়ারা হয়তো ডাকতনা | ইয়ার্কি দিলাম | ডাক মানেই তো পোস্টাল সার্ভিস | ঘোড়ার ডাক আর জি টি রোড নিয়ে এই খেজুরটা বহুদিন হল চলে আসছে | হাওড়া থেকে জি টি রোড ধরে দুর্গাপুর যাওয়াটা সর্বনাশের শামিল ছিল | আজকের মত এক্সপ্রেসওয়ে হয়নি | এতো বাস ছিলনা | এত ট্রেন হয়নি | তখন একটানে যাওয়ার জন্য জম্মু-তাওয়াই ছাড়া ভালো ট্রেন ছিলোনা | শিয়ালদা থেকে ছাড়ত | এখন কলকাতা থেকে ছাড়ে | হাওড়া থেকে বেশি ট্রেন ছিল কিন্তু হাওড়া অবধি কে যাবে | মাঝে মাঝে বর্ধমান লোকালে বর্ধমান পৌঁছে সেখান থেকে অন্য কোনও ট্রেন বা গাড়িতে বা বাসে দুর্গাপুর গেছি | বেশ বিকেল বিকেল গিয়ে নামতাম দুর্গাপুর স্টেশনে | সেখান থেকে ভারতী যেতে গেলে বাস ধরতে হয় |

আজকাল স্টেশনের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে | ভাড়া নেওয়া যায় | কলকাতা থেকেই অনেক ভালোভাবে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায় যেটা আগের সময়ে অতটা করা যেতনা রাস্তার জন্য | তখন কিন্তু ব্যাপারটার অত চল ছিলোনা |

বাসে চড়লে কিছুক্ষনের মধ্যে গান্ধী মোড় | এই মোড়েই দুহাত বাড়িয়ে আগন্তুককে নিজের করে নেয় ইস্পাত নগরী | ট্রেনে এলে যেমন আমার দিদান রাজবাঁধ এসে গেলেই মনে করত এবার নিজের লোকগুলোর কাছে এসে গেছি |

বিকেলে যখন গিয়ে দুর্গাপুরে নামতাম তখন কেমন একটা লাগতো যেন | ছোট বয়েস | ভাবতাম সকালে বাড়িতে ছিলাম আর বিকেলেই এতদূরে চলে এলাম? প্রথম সন্ধের আবছায়ার হাতছানিতে খুব ভালো লাগতো | ফাঁকা ফাঁকা ছড়ানো রাস্তাঘাট, অনেক কম লোকজন, গাড়িঘোড়া আর হলুদ বাতিগুলো | পিওর মেসমেরিজম | ভারতীতে বাস থেকে নামলে একটা প্রকান্ড মাঠ | অনেকগুলো চারতলা বাড়ি যেগুলো আসলে কোয়ার্টার | ওই মাঠটায় পৌঁছলেই আমার মনে হতো এই তো এটাই আমার দুর্গাপুর |

মাঠ থেকে নেমে একটু হাঁটলেই রাস্তার ডানদিকে লোহার গেটওয়ালা বাড়ি | একটা বেশ বড় ফাঁকা জায়গা | তারপর হলুদ রঙের চারতলা বিল্ডিংটা | নীচতলার ফ্ল্যাটটায় আমার মায়ের মামাবাড়ি | বিল্ডিংটার তিন পাশেই কমবেশি ফাঁকা জমি ছিল | সামনে আর পিছনে বেশ খানিকটা, বাঁদিকে অল্প | ডানদিকে আর একটা বিল্ডিং | ঠিক ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডের যেরকম ছবি দেখা যায় | সুন্দর রঙের বাড়ি, সবুজ মাঠ, মাঠের মাঝে পরিষ্কার রাস্তা |

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম সবসময়, ওখানে গেলেই খুব সকালে ঘুম ভেঙে যেত | আর সেই সুযোগে একটা মর্নিং ওয়াক হয়ে যেত | আমি এমনিতে স্ট্র্যাটেজিক রাইজার | সকালে কখন ঘুম থেকে উঠি সেটা আমার কাজের উপর ডিপেন্ড করে | সকাল দশটায় বেরতে হলে নটায় উঠি | তবে তখন তো পড়াশোনা ছাড়া কাজ ছিলনা | আর কোনোকালেই সেটাকে তেমন কাজ বলে ধরিনি | কিন্তু ভারতীর বাড়িতে সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ ঘুম ভেঙে যেত | গেটের বাইরে একটা আশ্চর্য সুন্দর কাঁঠালিচাঁপার গাছ ছিল | আমি সেই গাছটার নীচ থেকে অনেক অনেক ফুল কুড়িয়েছি | একটা সম্মোহন করার মত গন্ধ , যেটা গাছটা অনেক দূরে চলে গেলেও মনটাকে ছাড়তে চায়না | আসলে মনটাই বেশ খানিকক্ষণ বয়ে নিয়ে চলত গন্ধটাকে | নাক থেকে মাথা হয়ে শিরায় শিরায় গন্ধটা ঢুকে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে সেটা ফেড আউট হত | আমি আজও চোখ বন্ধ করে গাছটাকে ভাবলে সেই গন্ধটা পাই | যারা তখনকার দুর্গাপুরে এরকম চাঁপা, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলিয়া গাছগুলোর সাথে বৈধ বা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে, তারা আমার কথা বুঝতে পারবে |

একবার ভারতীতে বিয়েবাড়ি | আমি আর বাবা চণ্ডীদাসে গেলাম ফুল কিনতে | সেখানে বৃষ্টিতে একঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হল | চন্ডীদাসের মার্কেটটা খুব সুন্দর ছিল | নিউটনের মার্কেটটাও | সল্টলেকের মার্কেটগুলোর মতই ছিল মার্কেটগুলো | আজ শপিং মল হয়েছে | সেটা ভালো কিন্তু ওই মার্কেটগুলোর মত প্রাণ নেই ভাই | সারা পৃথিবীতে শপিং মল গুলো একরকম | কাঁচের দরজা, এস্ক্যালেটর, ঝকঝকে দোকান, দোকানীর সাথে খদ্দেরের কাউন্সিলার আর পেশেন্টের সম্পর্ক | ওই মার্কেটগুলোয় অনেক বন্ধুর মত দোকানীরা থাকতেন | মনে আছে নিউটন মার্কেট থেকে ক্যাডবেরির প্যাকেট কিনেছি বহুবার | সেই প্যাকেটগুলো দুর্মূল্য | একটা অসুবিধা ছিল তখনও, আজও মোটামুটি আছে | ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপ এরিয়া হওয়ার জন্য সন্ধে আটটার পর থেকে গাড়ি- টাড়ি কিছু পাওয়া যেতনা | একটা বাস চলে যাওয়া মানে বেনাচিতি থেকে আইনস্টাইন আসা একেবারে জলে | মনে আছে একটা ডাবল-ডেকার চলত | স্টেশন বাস-স্ট্যান্ড থেকে ছাড়ত | ভারতীর সেই মাঠে খেলতে খেলতে দেখতাম সামনের রাস্তা দিয়ে সেটা কোথায় চলে যেত | কে জানে কোথায় যেত |

নানা রঙের আত্মীয়-স্বজন | দুর্গাপুর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতেন | আজও ছড়িয়ে ছিটিয়েই আছেন তবে অনেকের জায়গা বদল হয়ে গেছে | মার্কনি, গ্যামন ব্রিজ, কোক-ওভেন, নিউটন, ডিরোজিও, বেনাচিতি, শ্যামপুর | এখন গল্প বদলে সেপকো, অমরাবতী, বিধান নগরের পাশে স্টিল পার্ক, গোল্ডেন পার্ক, সিটি সেন্টারের আসে পাশে চলে এসেছেন অনেকে | চাকরির মেয়াদ ফুরলে তো আর কোয়ার্টার থাকেনা | চাকরি করতে করতেই বাড়ি করেছেন অনেকে | কেউ অম্বুজায় ফ্ল্যাট কিনেছেন | তবে শ্যামপুরের পিসির ঠিকানা বদল হয়নি | বাঁকুড়া মোড় পেরিয়ে বাঁদিকে ঢুকলে শ্যামপুর | তারপরেই দামোদর, তারপরেই বাঁকুড়া | আমি বহুবার দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে ক্রুদ্ধ দামোদরকে দেখেছি | অপার্থিব সৌন্দর্য তার | বেশ কয়েকবার আমি সাইকেলে বা বাইকে বসে বর্ধমান-বাঁকুড়া প্যাসেঞ্জারি করেছি |

আজকে সিটি-সেন্টার হয়েছে | অনেক কমপ্লেক্স হয়েছে | অনেক নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে | ট্রয়কা, কুমার মঙ্গলম আর সায়েন্স পার্ক সাজানো হয়েছে | খুব সুন্দর | কিন্তু কিছুতেই আমি আমার আগের দুর্গাপুরকে পাইনা | এতে আমার কিছু করার নেই | আমি কিছুতেই আমার পুরোনো দুর্গাপুর থেকে বেরতেই পারিনা | টাউনশিপের কোয়ার্টারগুলো অনেক ভেঙেচুরে গেছে হয়তো কিন্তু আমার সেই ভাঙাচোরা দুর্গাপুরটা যেন আমায় পাগলের মত ডাকে | চূড়ান্ত ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় আজকাল খুব বেশি যাওয়া হয়না | পরিচিত দুর্গাপুরটাও গত কয়েক বছরে অনেকটা অপরিচিত হয়ে উঠেছে | আত্মীয়দের সাথে ফোনে-ফেসবুকে যোগাযোগটাই যা আছে | তাদের সংখ্যাও প্রকৃতির নিয়মে কমতির দিকে | তবু কখনও সখনও এয়ারপোর্টের মোড়ে দুর্গাপুর লেখা বাস দেখলে মনের মধ্যে সেই চাঁপা ফুলগুলোর নরম শরীর টের পাই | জানিনা গাছটা আজও আছে কিনা | ফুলগুলো আজও ফোটে কিনা |

মাথার মধ্যে আর একটা জায়গার কথা খুব বেশি করে ভেসে ওঠে | দুর্গাপুরের কাছেই | সেটা আমার, একান্ত আমার আসানসোল | হাটন রোড, চেলিডাঙ্গা, ঘাঁটি গলি, মুরগাসোল, ঊষাগ্রাম, মহিশীলার ম্যাজিক মাখানো আসানসোলের গল্প অন্যদিন বলব | আজ নয় | Wo kahani fir sahi.

কয়লাকুঠী

স্কুলে পড়ার সময় প্রায় প্রত্যেক বার পুজোর পর একটা কান্ড হত | দশমী চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে প্যাকিং শুরু হত | লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন আমরা সবাই মিলে গিয়ে উঠতাম আসানসোলে | দুর্গাপুর যাওয়ার মতই জার্নিগুলো ছিল তবে আর একটু লম্বা মানে আরও এক বা দেড় ঘন্টা বেশি | যখন থেকে এক্সপ্রেসওয়ে হল তখন থেকে মজাটা আরও বেড়ে গেল | শিয়ালদা-আসানসোল ইন্টারসিটি হওয়ার পর থেকে মজাটা পুরোপুরি স্বর্গীয় হয়ে উঠল | ইন্টারসিটি দুর্গাপুর ঢোকে সন্ধে আটটা নাগাদ | তারপর ওয়ারিয়া, অন্ডাল, রানীগঞ্জ পেরিয়ে কালীপাহাড়ি হয়ে আসানসোল ঢোকে | কালীপাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেনটা মোটামুটি যেন কোলিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে ছোটে | দুপাশে কয়লার স্তুপ | মাঝখান দিয়ে ফাটিয়ে ছুটছে ইন্টারসিটি | এরকম দেখলেই আমার মনটা দুর্দান্তরকম ভাল হয়ে যেত | বাতাসে ভেসে বেড়ানো কালচে কয়লামাখা সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেটেড ম্যাটার ভালবাসা হয়ে আমার নাকে-মুখে এসে লাগত | বুঝতাম এসে গেছি আমার আসানসোলে | যেখানে ঘাঁটিগলিতে লিট্টি পাওয়া যায় আর রাস্তাগুলোয় চড়াই-উৎরাই আছে |

ভ্রমণ সঙ্গী আসানসোলকে কয়লাকুঠী নাম দিয়েছে | নামটা দুর্দান্ত |  কয়লাকুঠীই বটে | ঝাড়খন্ড লাগোয়া কোলিয়াড়ি অঞ্চল | খাদানে খাদানে ভরা | ছোটবেলা থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিওগ্রাফিতে আসানসোলকে শিল্পে জমে থাকা অঞ্চল বলেই জেনেছি | তবে বইয়ের জ্ঞানটা শুধু পরীক্ষাতেই কাজে লাগত যদি না ছোটবেলা থেকে বারবার আসানসোল যেতাম | দুর্গাপুর মায়ের তরফ, আসানসোল বাবার দিক | তবে একটা অ্যাঙ্গেল থেকে | পরিবারের পৈতৃক একটা শাখা বিশেষ কারণে আসানসোলে গিয়ে সেটল করে | কারনটা হল আমার এক দাদুর রেলের চাকরি | আমার নিজের ঠাকুরদা নন | ঠাকুরদার জ্ঞাতি ভাই | প্রথম পক্ষের স্ত্রী বেশ কয়েকজন সন্তানকে রেখে মারা যান | উনাকে আমি দেখিনি | দাদু দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন | দিদা ছিলেন নাটোরের কোনও এক জমিদার বাড়ির পূর্বতন নায়েবের মেয়ে | সেই নায়েবকে দুটো কারণে শতকোটি প্রণাম | প্রথমত কি ভেবে তিনি তার মেয়েকে এই অভাবের সংসারে দিয়েছিলেন | দ্বিতীয়ত ভাগ্গিস দিয়েছিলেন নইলে দুপক্ষের প্রায় দশজন সন্তান জানতেও পারতনা যে মা বলতে আসলে কি বোঝায় |

দিদা একেবারেই মা দূর্গা ছিলেন | দুই হাতে দশ হাত এর কাজ করতেন | একটা বিরাট সংসার যেটাকে ভালবেসে রাবনের বাপের গুষ্টি বলা যায় সেটাকে নিজের দমে রোজ শাসন, শোধন ও পালন করে গেছেন | কাউকে মারতে হয়নি, ধরতে হয়নি, গালি দিতে হয়নি | স্নেহের শক্তিতে রাজ্য চালানোর ব্যাপারটা বড় শক্ত | দিদা সারাজীবন এই কঠিন কাজটা বড় সহজে করে গেছেন | বড়ে আরামসে | তো সেইযে বললাম লক্ষীপুজোর আগের দিন আসানসোলে গিয়ে পৌঁছতাম সেটা যতটা পুজোর টানে ঠিক ততটাই দিদার টানে | আর একটা টান আমাদের ছিল | মানে আমার আর বোনের | দুর্গাপুর থেকে পিসতুতো দাদা আর বোন এসে জুটত | লক্ষ্মীপুজোর দিন হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার, সাথে সন্ধেবেলা বাজি পোড়ানো ও ফাটানো | দ্বিতীয় ব্যাপারটার জন্যে অনেকবার বকা খেয়েছি | তবে গায়ে মাখিনি | মোটামুটি এক প্যাকেট চকলেট বোম ফাটাতাম আমি আর দাদা | প্যাকেট চারেক কালী পটকা | গোটা কুড়ি আলু বোম | সন্ধে বেলায় কাতারে কাতারে লোক আসত | দেবভোগ্য খিচুড়ি আর স্বপ্নের পায়েস খেয়ে যেত | জীবনে আর কোথাও কোনোদিনও ওই খিচুড়ি আর পায়েস আমার কপালে জোটেনি আর জুটবেওনা |

অত আত্মীয়-স্বজন থাকা সত্ত্বেও কিন্তু আমরা ম্যাক্সিমাম টাইম হোটেলেই থাকতাম | আসলে কারও বাড়িতে গিয়ে উঠলে তাদের সমস্যা হতে পারে সেটা ভেবেই সাধারনতঃ আমরা ঘাঁটিগুলিতে রাজর্ষি হোটেলে থাকতাম | একবার হয়তো ভ্যালি ভিউ তে ছিলাম | রাজর্ষি হোটেলটা আমার স্বপ্নের থেকেও সুন্দর | রিসেপশন পেরলে একটা খুব বড় ফাঁকা জায়গা | চারদিকে ঘরগুলো | পুরো এরিয়াটা সাদা রঙের | মাঝখানে একটা সাদা জলের ফোয়ারা | ওই বয়সে আমার ওই জায়গাটা দুর্দান্তরকম ভাল লাগত | বাইরে বেরিয়ে পাশেই একটা বাজার | যেখান থেকে মা লক্ষ্মীপুজোর সকালে পদ্মফুল কিনে মহিশীলাতে দিদাকে নিয়ে গিয়ে দিত | দিদার মুখে একটা “ইউ হ্যাভ মেড মাই ডে” স্মাইল ফুটে উঠত | যে বাড়ির কথা এতক্ষন বললাম সেই মহিশীলা কলোনির বাড়িতে একটা বিরাট কুয়ো ছিল | যাকে আসলে ইঁদারা বলে | বড়, বাঁধানো, কপিকল ওয়ালা |

সেই ইঁদারার পাশে একটা ফাটাফাটি স্থলপদ্ম গাছ ছিল | হয়তো এখনও আছে | অনেকদিন যাওয়া হয়নি | গোলাপি রঙের ফুলগুলো হাওয়ায় দুলত | পুজোতেও লাগত | সেই কুয়োর ঠান্ডা জলে আমি অনেকবার স্নান করেছি | বাড়িটা আজও আমায় কথায় কথায় হন্ট করে চলেছে | বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসেই একটা প্রকান্ড গাছ | বট বা অশ্বথ্ব হবে | নীচের দিকটা বাঁধানো | অনেকলোক সেখানে বসে বাসের জন্যে ওয়েট করত | পাশেই রিকশা স্ট্যান্ড | সেখান থেকে রিক্সা নিয়ে আমরা ঘাঁটিগুলিতে ফিরে আসতাম |

আসানসোল আধা বাঙালি আধা বিহারি শহর হওয়ায় কালচারটা একটু অন্যরকম ছিল | খাবার হোটেলগুলোতে আবার কুকরা অনেকে বাঁকুড়ার লোক হওয়ায় রান্নাতেও একটা মিলিজুলি প্রভাব ছিল | বিউলির ডাল আর আলু দিয়ে ঝোলা পোস্ত তো আছেই | মাছ, মাংস, তরকা সবকিছুতেই তরকারিগুলো একটু বড় বড় করে কাটা | আমার রাতে রুটি-তরকা খাওয়া হয়তো ওখানেই প্রথম | তরকাতে বেশ টমেটো, কাঁচা লঙ্কা দেওয়া থাকত | উপরে ধনেপাতার গার্নিশিং | ওই যে তরকার নেশা লেগে গেল, সেটা আজও ছাড়েনি |এখনও ধাবায় গাড়ি থামলে তরকা বলে হাঁক দিই | ঘাঁটিগলিতে বেশ কিছু জায়গায় লিট্টি বিক্রি হয় | অনেকে লিট্টি-চোখা খেতে খেতে ভোজপুরি গান শোনে | বহিয়া মে তু হামরি সমাজা গোরিয়া, কুছ কুছ হোলা ধরকেলা ইয়ে জিয়া | মানেটা সবাই বুঝতে পারবে | ভোজপুরি বলা বেশ টাফ | আমি চেষ্টা করেও পারিনা তেমন |

মহিশীলার বাড়ির সকলে ওই বাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে পর্যন্ত চেলিডাঙ্গায় রেল কোয়ার্টারে থাকত | বড় পিসিমনি বিয়ের পর থেকে ঘাঁটিগলিতেই | বহুবার গেছি সেই বাড়িতে | ঘাঁটিগলির পরিবেশটা চিরকাল আমায় বড় বেশি টানে | বিশেষ করে গলি থেকে বেরিয়ে হাটন রোডের দোকানগুলো | কত রকমের জুতো পাওয়া যেত বা যায় | আমি অনেক সময় একাই ঘুরে বেড়াতাম আর ওই বাজারটা পাঁচ-সাতবার চক্কর মারতাম | থানার কাছে হয়তো এখনও সেই দারুন ছোলা-ভটুরাটা পাওয়া যায় | শীতের শুরুতে পাতলা কম্বল নিয়ে সওদা করে দোকানিরা | একবার অফিস ছুটি না পাওয়ায় আমি দিদির বিয়েতে যেতে পারিনি | মা একটা কম্বল নিয়ে এসেছিল | সেটা এখনও আমি গায়ে জড়াই | মনে আছে মহিশীলা ছাড়িয়ে আরও এগোলে ঊষাগ্রামের দুর্গাপুজোর ঠাকুর অনেকদিন থাকত | লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনের সন্ধেয় আমি সে ঠাকুর দেখেছি সবার সাথে | এমন আশ্চর্য ছিল আমার আসানসোল |

 

বকদ্বীপ

বহুদিন হল বকখালি যাইনা | বন্ধুরা মিলে একবার দীঘা গেছিলাম ঘুরতে | সেবার ফিরে আসার পর ভ্রমণে একটা লেখা পড়ি | নবরূপে বকখালি | লেখক অচিন্ত্য আইচ | এমনিতে দেখবে কোথাও থেকে ঘুরে আসার পর আবার কোথাও একটা যেতে খুব ইচ্ছে করে | তো সেই লেখাটা পড়ে আবার এরকম একটা ইচ্ছে মাথার মধ্যে বেশ কায়েমী হয়ে উঠল | কিন্তু তখনই যাওয়া হলনা | প্রায় বছর খানেক পরে প্রথমবার বকখালি গেলাম | তারপর থেকে সাকুল্যে ছ-বার গেছি | লোকে এখন মজা করে বলে ওটা নাকি আমার সেকেন্ড হোম | কিন্তু কেন বকখালি? কি আছে ওখানে যে ছ-বার যাওয়ার পরেও আমার এখনও মোহ কাটলনা ? এই প্রশ্নগুলো উঠতে পারে | ছোটবেলায় কনসেপ্ট অতটা ক্লিয়ার ছিলোনা | এক হতভাগা বকখালিকে বকদ্বীপ বলত | কিছুই বুঝতামনা | জায়গাটা কোথায়? কিভাবে যেতে হয় কিছুই জানতামনা | যেদিন জানলাম সেদিন থেকে সে পথে আমি গেছি বার বার | বকখালিতে বারবার কেন যাই, সেটাই বলার চেষ্টা করছি |
বকখালি সুন্দরবনে | বলতে গেলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার শেষ প্রান্তে | অন্তত ওই লাইনে | ট্রেনে বকখালি যেতে হলে নামখানা পৌঁছতে হয় লোকাল ট্রেনে | এক্সপ্রেস ট্রেনের সুবিধা নেই |বাসে যাওয়া যায় কিন্তু সে বড় খাটনি | গাড়িতে গেলেও একটু ঝামেলা | শিয়ালদা থেকে নানা স্টেশনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে নামখানা লোকাল প্রায় তিন ঘন্টা লাগায় নামখানা ঢুকতে | কাকদ্বীপ স্টেশনের পরেই ছোট নদী দেখতে পাওয়া যায় | নদীর উপর রং-বেরঙের মাছধরা ট্রলার | তবে ট্রেনের গতির জন্যে এক ঝলকই দেখা যায় | তখনই মনটা ভালো হয়ে যায় | কাকদ্বীপের পরের স্টেশন উকিলের হাট | হাটে উকিল বিকোয় কিনা জানিনা | এ নামের উৎস সন্ধানে যায়নি কখনও | পরিবারে যথেষ্ট উকিল থাকলেও উকিলদের ধার মাড়াতে খুব একটা ইচ্ছে কোনোদিন হয়নি | আজকাল অবশ্য নিজের পেশাগত কারণে উনাদের সান্নিধ্যলাভ হচ্ছে অবরে-সবরে | উকিলের হাট স্টেশনের পরেই নামখানা | এ লাইনে এখনো অবধি শেষ স্টেশন | নামখানা থেকে ভ্যান-রিক্সায় ফেরিঘাট যেতে হয় | নদীর নামটা খুব মজার | হাতানিয়া-দোয়ানিয়া | ফেরিঘাটটা দেখে গল্পে পড়া গোয়ালন্দ স্টীমার ঘাটের কথা মনে পড়ে যায় | যদিও সেটি দেখিনি কখনো |
বড় বড় মাছধরা ট্রলার | লাল, নীল, কমলা | ঘাটে ঢোকার মুখে খাবারের হোটেল | একটা দারুন মিষ্টির দোকান আছে | শীতকালে ফাটাফাটি নলেন গুড়ের রাজভোগ বানায় | ওটা আবার গুড়ের জেলা কিনা | খেজুরের রস থেকে শীতকালে একঘর গুড় তৈরী হয় | এই গুড় তৈরির জীবন নিয়েই নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প রস | পরে বাসু চ্যাটার্জির বিখ্যাত সিনেমা সওদাগর বানানো হয় এই গল্প থেকেই | শুটিং হয়েছিল কামদুনিতে | যেটা উত্তর চব্বিশ পরগনাতে | আসলে সাবেক চব্বিশ পরগনা থেকেই উত্তর ও দক্ষিণ হয় | তাই দুই পরগনাই মোটামুটি একরকম |
হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরতে হয় ভটভটি নৌকায় | গাড়িতে এলে বার্জে পেরতে হয় | ভাসমান বার্জ বা ভেসেলে গাড়ি উঠে যায় , এমনকি বাস-ও | ভেসেলটা সবসমেত নদী পেরিয়ে যায় | তারপর বকখালি আর ২৫ কিলোমিটার | বাস আছে | গাড়ি ভাড়া নেওয়া যায় | ফ্রেজারগঞ্জের এরিয়া পেরিয়ে সোজা বকখালি বিচ | প্রথম বার মাত্র একরাত ছিলাম | একদম ফাঁকা একটা বিচ কতটা অসামান্য সুন্দর হতে পারে সেই অভিজ্ঞতাটা প্রথম বার হয়েছিল | কেমন যেন বিষন্ন | ব্রেক-আপের পর প্রথম প্রথম মেয়েদের আর পরের দিকে ছেলেদের যেমন হাবভাব হয়, সেরকম |সামনে বকখালি অবধি ট্রেন যাবে |হাতানিয়া-দোয়ানিয়াতেও ব্রিজ হয়ে যাবে |
এই একলা-পনাটাই বকখালিতে আমায় বার বার টেনে নিয়ে যায় | বিচে দাঁড়িয়ে যখন দেখি সামনের ফাঁকা সমুদ্রের সাথে ফাঁকা বিচটা একদম মিশে গেছে তখন মনে হয় কোথাও গিয়ে এই স্পেসটা আমার দরকার ছিল | আমার বকখালি আমায় এই স্পেসটা দেয় | বিচটা কিন্তু হলদে বালির নয় | বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলটা খাঁড়ি-ঘেঁষা | বিচটা সাদা বালি আর পলিমাটি মেশানো | একটু hardy, দিঘার মত পাড় উপচে আসা ঢেউ নেই এখানে | অনেক নিথর, অনেক নিস্পন্দ সমুদ্র | বিচ জুড়ে লাল কাঁকড়াদের কলোনি | দূর থেকে দেখলে মনে হয় লাল চাদর হাওয়ায় দুলছে | এই লালিদের সাথে ছুটে ছুটে আমার অনেক সময় গেছে | কোনোদিন একটাও ধরতে পারিনি | তাড়া করলেই এরা ছুটে গর্তে ঢুকে পড়ে | আসলে বিচের নিচে এদের একটা অন্য পৃথিবী আছে | গর্তের পর সুড়ঙ্গ টাইপ পালাবার জায়গা আছে | তবে বালি খুঁড়ে বের করা যায় | একবার আমার ভ্যানওয়ালা দাদা বালি খুঁড়ে একটাকে বের করে দেখিয়েছিল | এদের একটা আলাদা মানসিকতা, একটা আলাদা দর্শন | কাউকে ধরা দিতে চায়না | মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় | আমার মতো | আমিও তাই বেরিয়ে যাই, সঙ্গী আমার এই কালরাত্রিটাই | রূপমের গানটা আমাদের জন্যই হয়তো | আমরা ফ্রি-জোনের জীব |
পালতোলা নৌকো, পালছাড়া ভটভটি আর জেলেদের ডিঙিগুলো ভেসে বেড়ায় | মাছ ওঠেতো অনেক | বাজারে গেলেই দেখা যায় | তবে ফ্রেজারগঞ্জ হল মাছের আড়ত | সেখানে হারবারে ট্রলার ভেড়ে | মাছের নিলাম হয় | বকখালি আমায় সস্তায় সর্ষে ইলিশ আর গরম ভাত সাজিয়ে দিয়ে যত্ন করে খাওয়ায় | তা সেখানে যাবনাটা কেন ? মাঝারি সাইজের ইলিশের পিস | কাঁচালঙ্কা আর সর্ষে দেয়া gravy | গরম ভাতে খেতে খেতে মনে হয় এটাই বঙ্গোপসাগর মন্থন করে পাওয়া অমৃত | এই খাবারের আসল জায়গা রাস্তার ধারের খুব সাধারণ মানের হোটেল | যেখানে চেয়ার-টেবিল গুলোও standard নয় | শুধু রাঁধুনি-দিদির হাতের গুনে আর দাদার পরিবেশনে পুরো ব্যাপারটা স্বর্গের মত হয়ে যায় |এই বকখালির স্বাদ আমায় কোনোদিন গোয়া বা মায়ামি দিতে পারবে না | দুটোর কোনোটাতেই না গিয়ে বলছি | বকখালিকে আমার মন থেকে মুছতে পারে এমন কোনো মাই কা লাল হয়নি |
বিচের উল্টো ধারের রাস্তা ধরে গেলে হেনরিজ আইল্যান্ড | গোটা একটা দ্বীপে হাত ধরাধরি করে মাছ ধরাধরি চলছে | দ্বীপের সর্বশেষ বিন্দু হল কিরণ বিচ | সাধারণত যখন কিরণ বিচে গিয়ে নামি তখন আমি, আমার ভ্যানওয়ালা দাদা আর লালিরা ছাড়া কেউ থাকেনা | এমন নৈঃশব্দের উৎসব ছেড়ে কেউ অন্য কোথাও যায়? কিরণ বিচে দাঁড়ালে মনে হয় যেন আমার caste – away condition চলছে | মাস্তুল ভেঙে জাহাজ ডুবেছে আর আমি সংকর মাছের লেজ ধরে ডাঙায় পৌঁছে কোনোভাবে বেঁচে গেছি | সাদা বালি মেখে মুখ থুবড়ে পরে আছি বিচে | কাঁকড়াগুলো শরীরের উপরে উঠে বুঝতে চাইছে এ আমাদের শত্রু না বন্ধু | গাছের ভাঙা ডাল, ম্যানগ্রোভের বন যেন একটু সন্দিহান আমায় নিয়ে | হয়তো তারাও ভয় পায় | তবে সময় এগোলে এরা সবাই বোঝে আমিও এদের মতই একজন | শুধু তফাৎ একটাই | ওদের দিনরাত মোটামুটি এক | আর আমার জীবনে এই সুখের নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী মাত্র | কয়েক লহমা পরেই আবার আমায় নামখানা থেকে ট্রেন ধরতে হবে |
যে রাস্তার কথা বললাম সেটা এখন কংক্রিটের | আগে যখন ইঁট বাঁধানো ছিল তখন একবার বন্ধুরা মিলে কিরণ বিচ থেকে ফিরছিলাম ওই রাস্তা ধরে | সবাই মিলে ভ্যানে | গ্রাম-চেরা রাস্তা | তখন সবে সন্ধে নেমেছে | অন্ধকার, মাঝে মাঝে বাড়িগুলোর টিমটিমে আলো | সৈকত ভ্যানে বসে বসে গাইছিলো, এ কি লাবণ্যে | ওই রাস্তায় ওই অন্ধকারে ওই সময় ওই নিষ্পাপ গলায় ওই গান | কেমন লেগেছিল বলবনা | বুঝবেনা তুমি | ঠিক ওইভাবে একদিন গানটা শোনো তবে বুঝবে | সেবার ফ্রেজারগঞ্জ হারবার থেকে ২০ টাকায় ২ কিলো লোটে মাছ কিনে ৫০ টাকা দিয়ে চপ বানানো হয়েছিল | সন্ধেয় মুড়ির সাথে দেদার চপ | তাও অন্ধকারে টেবিল পেতে বসে | রাতে বিচে গিয়ে গান শুরু হল | প্রায় দশটার সময় দুজন পুলিশ এসে আমাদের উঠে যেতে বললেন | রানা পুলিশদের কাছে অদ্ভুত আবদার করে বসল | “আর দুটো গান গাইব, গেয়েই উঠে যাব |” পুলিশরা আর কিছু বলেননি | আচ্ছা বলো দেখি, নিজের গায়ে এরকম পাগলামির বালি মাখতে আর কোথায় যাব আমি? বকখালি ছাড়া ?
DSCN2420_FotorDSCN2415_FotorDSCN2397_FotorDSCN2329_FotorDSCN2352_FotorDSCN2369_Fotor