ইস্পাত নগরী

বর্ধমান ছাড়ার পরে জানলার বাইরেটা দেখতে দেখতে মনটা কেমন চুপ করে গেছিল | ট্রেনটার স্পিড কমার সাথে সাথে সেটা আবার জেগে উঠছিল একটু একটু করে | খুব জোরে ট্রেন চললে বাইরে উল্টো-ছোটা দুনিয়াটা আমায় চিরকাল একটা ঘোরলাগা ভুতুড়ে অবস্থার মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে | এবার আমি আস্তে আস্তে আবার ট্রেনের মধ্যে ফিরতে থাকলাম | কানের কাছে  জোরালো গলায় “মশলা মুড়ি ” বলে একটা আওয়াজ এই ঘোরটা পুরোপুরি কাটাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল | টিনের বাক্সতে ঠনঠন আওয়াজ, বড় চামচ দিয়ে স্টিলের কৌটোর মধ্যে অভ্যস্ত হাতে মুড়ি মাখার শব্দ, আচারের গন্ধ, ঠোঙায় ভরা মুড়ির ওপর নারকেল ফালি দিয়ে ট্রেনসুলভ গার্নিশিং | এমনিতেই হাতটা বুক পকেটে চলে গেল | টাকা বের করলাম | দু-মিনিট পরে যখন বাঁহাতে ঠোঙা নিয়ে ডানহাতে নারকেলে কামড় মারলাম তখনই ট্রেনটা একটা হ্যাঁচকা মেরে স্টেশনে দাঁড়ালো | খানা জংশন | এবার ট্রেন ঠিক লাইন ধরবে | আসলি খেল শুরু হবে এবার | আমি চলেছি আমার ছোটবেলায় | দুর্গাপুর | তবে আমার এই জার্নিটা কিন্তু আজ লিখতে বসিনি | আজ লিখতে বসেছি বেশ কিছু পুরোনো কথা | যে কথাগুলো আমি জানি আর অন্য কয়েকজন জানে | আর জানে এই রেললাইনটা |

উত্তর প্রদেশের কানপুরের এক প্রবাসী বাঙালি পরিবার | গৃহকর্তা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির ইঞ্জিনিয়ার | বদলির চাকরি | তবে কানপুরে অনেকদিন থাকতে হয়েছিল | আর্মাপুরে কর্মক্ষেত্র ও কোয়ার্টার | প্রবাসী বাঙালি ক্লাবের দুর্গাপুজো, ফাংশান, নাটকে অভিনয়, গ্রীন পার্কে ক্রিকেট সব মিলিয়ে বড় সাইজের পরিবারটার জমজমাট ব্যাপার | কানপুরে থাকতে থাকতেই বড় মেয়ের বিয়ে | সোজা হাওড়ার বেলুড়ে | তারপর পরিবারটা চলে এল দুর্গাপুরে | এই ট্রান্সফারটা হঠাৎ করেই বড় মেয়ের বাপের বাড়ির কনসেপ্টটাই বিলকুল বদলে দিয়েছিল | তারপর থেকে দুর্গাপুরের কোয়ার্টারই আমার দিদানের বাপের বাড়ি হয়ে ওঠে | প্রথমে নিউটন এভিনিউ, তারপর ভারতী | আমি কিন্তু দিদানের বাপের বাড়ি বা আমার মায়ের মামাবাড়ি বলতে ভারতীর সেই কোয়ার্টারটাই বুঝি | নিউটন-এর আগের কোয়ার্টারটায় পুরো ফ্যামিলি যখন থাকত তখন আমার জ্ঞান হয়নি | পরে দেখেছি সেটা |

স্বাধীনতার পরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে দুর্গাপুর | স্টিল তৈরী করার জন্যে | দেশের নানা প্রান্ত থেকে নানারকম কারিগরি লোকজন এসে জোটেন | একটা ব্লেনডেড সোসাইটি তৈরী হয় | চারতলা কোয়ার্টারের দো-তলায় ইডলি তৈরী হলে সেটা একতলায় আসতো | তেমনই একতলার ভাজা শুক্ত দোতলায় যেত | শিল্প অভিমুখে দৌড়তে থাকা দুর্গাপুর নিজেকে এভাবেই  কসমো বানিয়ে নিয়েছিল সেদিন | এই প্রসেসটা যখন বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একটা স্বতন্ত্র দুর্গাপুর তৈরী হয়েছে তখন থেকে আমি দুর্গাপুরে যাচ্ছি আর আসছি |

আজ পানাগড়েও বাইপাস হয়েছে | তখন শুধু জি টি রোড ছিল | গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড | শের শাহ সুরী সেই কবে তৈরী করেছিলেন | নাম দিয়েছিলেন সড়ক-এ-আজম | মূলতঃ হর্স পোস্ট মানে ঘোড়ার মাধ্যমে চিঠি-পত্র সাপ্লাইয়ের জন্য | ঘোড়ার ডাকের প্রচলন হয় | তার আগে ঘোড়ারা হয়তো ডাকতনা | ইয়ার্কি দিলাম | ডাক মানেই তো পোস্টাল সার্ভিস | ঘোড়ার ডাক আর জি টি রোড নিয়ে এই খেজুরটা বহুদিন হল চলে আসছে | হাওড়া থেকে জি টি রোড ধরে দুর্গাপুর যাওয়াটা সর্বনাশের শামিল ছিল | আজকের মত এক্সপ্রেসওয়ে হয়নি | এতো বাস ছিলনা | এত ট্রেন হয়নি | তখন একটানে যাওয়ার জন্য জম্মু-তাওয়াই ছাড়া ভালো ট্রেন ছিলোনা | শিয়ালদা থেকে ছাড়ত | এখন কলকাতা থেকে ছাড়ে | হাওড়া থেকে বেশি ট্রেন ছিল কিন্তু হাওড়া অবধি কে যাবে | মাঝে মাঝে বর্ধমান লোকালে বর্ধমান পৌঁছে সেখান থেকে অন্য কোনও ট্রেন বা গাড়িতে বা বাসে দুর্গাপুর গেছি | বেশ বিকেল বিকেল গিয়ে নামতাম দুর্গাপুর স্টেশনে | সেখান থেকে ভারতী যেতে গেলে বাস ধরতে হয় |

আজকাল স্টেশনের বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে | ভাড়া নেওয়া যায় | কলকাতা থেকেই অনেক ভালোভাবে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায় যেটা আগের সময়ে অতটা করা যেতনা রাস্তার জন্য | তখন কিন্তু ব্যাপারটার অত চল ছিলোনা |

বাসে চড়লে কিছুক্ষনের মধ্যে গান্ধী মোড় | এই মোড়েই দুহাত বাড়িয়ে আগন্তুককে নিজের করে নেয় ইস্পাত নগরী | ট্রেনে এলে যেমন আমার দিদান রাজবাঁধ এসে গেলেই মনে করত এবার নিজের লোকগুলোর কাছে এসে গেছি |

বিকেলে যখন গিয়ে দুর্গাপুরে নামতাম তখন কেমন একটা লাগতো যেন | ছোট বয়েস | ভাবতাম সকালে বাড়িতে ছিলাম আর বিকেলেই এতদূরে চলে এলাম? প্রথম সন্ধের আবছায়ার হাতছানিতে খুব ভালো লাগতো | ফাঁকা ফাঁকা ছড়ানো রাস্তাঘাট, অনেক কম লোকজন, গাড়িঘোড়া আর হলুদ বাতিগুলো | পিওর মেসমেরিজম | ভারতীতে বাস থেকে নামলে একটা প্রকান্ড মাঠ | অনেকগুলো চারতলা বাড়ি যেগুলো আসলে কোয়ার্টার | ওই মাঠটায় পৌঁছলেই আমার মনে হতো এই তো এটাই আমার দুর্গাপুর |

মাঠ থেকে নেমে একটু হাঁটলেই রাস্তার ডানদিকে লোহার গেটওয়ালা বাড়ি | একটা বেশ বড় ফাঁকা জায়গা | তারপর হলুদ রঙের চারতলা বিল্ডিংটা | নীচতলার ফ্ল্যাটটায় আমার মায়ের মামাবাড়ি | বিল্ডিংটার তিন পাশেই কমবেশি ফাঁকা জমি ছিল | সামনে আর পিছনে বেশ খানিকটা, বাঁদিকে অল্প | ডানদিকে আর একটা বিল্ডিং | ঠিক ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডের যেরকম ছবি দেখা যায় | সুন্দর রঙের বাড়ি, সবুজ মাঠ, মাঠের মাঝে পরিষ্কার রাস্তা |

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম সবসময়, ওখানে গেলেই খুব সকালে ঘুম ভেঙে যেত | আর সেই সুযোগে একটা মর্নিং ওয়াক হয়ে যেত | আমি এমনিতে স্ট্র্যাটেজিক রাইজার | সকালে কখন ঘুম থেকে উঠি সেটা আমার কাজের উপর ডিপেন্ড করে | সকাল দশটায় বেরতে হলে নটায় উঠি | তবে তখন তো পড়াশোনা ছাড়া কাজ ছিলনা | আর কোনোকালেই সেটাকে তেমন কাজ বলে ধরিনি | কিন্তু ভারতীর বাড়িতে সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ ঘুম ভেঙে যেত | গেটের বাইরে একটা আশ্চর্য সুন্দর কাঁঠালিচাঁপার গাছ ছিল | আমি সেই গাছটার নীচ থেকে অনেক অনেক ফুল কুড়িয়েছি | একটা সম্মোহন করার মত গন্ধ , যেটা গাছটা অনেক দূরে চলে গেলেও মনটাকে ছাড়তে চায়না | আসলে মনটাই বেশ খানিকক্ষণ বয়ে নিয়ে চলত গন্ধটাকে | নাক থেকে মাথা হয়ে শিরায় শিরায় গন্ধটা ঢুকে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে সেটা ফেড আউট হত | আমি আজও চোখ বন্ধ করে গাছটাকে ভাবলে সেই গন্ধটা পাই | যারা তখনকার দুর্গাপুরে এরকম চাঁপা, কৃষ্ণচূড়া, বোগেনভিলিয়া গাছগুলোর সাথে বৈধ বা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছে, তারা আমার কথা বুঝতে পারবে |

একবার ভারতীতে বিয়েবাড়ি | আমি আর বাবা চণ্ডীদাসে গেলাম ফুল কিনতে | সেখানে বৃষ্টিতে একঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হল | চন্ডীদাসের মার্কেটটা খুব সুন্দর ছিল | নিউটনের মার্কেটটাও | সল্টলেকের মার্কেটগুলোর মতই ছিল মার্কেটগুলো | আজ শপিং মল হয়েছে | সেটা ভালো কিন্তু ওই মার্কেটগুলোর মত প্রাণ নেই ভাই | সারা পৃথিবীতে শপিং মল গুলো একরকম | কাঁচের দরজা, এস্ক্যালেটর, ঝকঝকে দোকান, দোকানীর সাথে খদ্দেরের কাউন্সিলার আর পেশেন্টের সম্পর্ক | ওই মার্কেটগুলোয় অনেক বন্ধুর মত দোকানীরা থাকতেন | মনে আছে নিউটন মার্কেট থেকে ক্যাডবেরির প্যাকেট কিনেছি বহুবার | সেই প্যাকেটগুলো দুর্মূল্য | একটা অসুবিধা ছিল তখনও, আজও মোটামুটি আছে | ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপ এরিয়া হওয়ার জন্য সন্ধে আটটার পর থেকে গাড়ি- টাড়ি কিছু পাওয়া যেতনা | একটা বাস চলে যাওয়া মানে বেনাচিতি থেকে আইনস্টাইন আসা একেবারে জলে | মনে আছে একটা ডাবল-ডেকার চলত | স্টেশন বাস-স্ট্যান্ড থেকে ছাড়ত | ভারতীর সেই মাঠে খেলতে খেলতে দেখতাম সামনের রাস্তা দিয়ে সেটা কোথায় চলে যেত | কে জানে কোথায় যেত |

নানা রঙের আত্মীয়-স্বজন | দুর্গাপুর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতেন | আজও ছড়িয়ে ছিটিয়েই আছেন তবে অনেকের জায়গা বদল হয়ে গেছে | মার্কনি, গ্যামন ব্রিজ, কোক-ওভেন, নিউটন, ডিরোজিও, বেনাচিতি, শ্যামপুর | এখন গল্প বদলে সেপকো, অমরাবতী, বিধান নগরের পাশে স্টিল পার্ক, গোল্ডেন পার্ক, সিটি সেন্টারের আসে পাশে চলে এসেছেন অনেকে | চাকরির মেয়াদ ফুরলে তো আর কোয়ার্টার থাকেনা | চাকরি করতে করতেই বাড়ি করেছেন অনেকে | কেউ অম্বুজায় ফ্ল্যাট কিনেছেন | তবে শ্যামপুরের পিসির ঠিকানা বদল হয়নি | বাঁকুড়া মোড় পেরিয়ে বাঁদিকে ঢুকলে শ্যামপুর | তারপরেই দামোদর, তারপরেই বাঁকুড়া | আমি বহুবার দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে ক্রুদ্ধ দামোদরকে দেখেছি | অপার্থিব সৌন্দর্য তার | বেশ কয়েকবার আমি সাইকেলে বা বাইকে বসে বর্ধমান-বাঁকুড়া প্যাসেঞ্জারি করেছি |

আজকে সিটি-সেন্টার হয়েছে | অনেক কমপ্লেক্স হয়েছে | অনেক নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে | ট্রয়কা, কুমার মঙ্গলম আর সায়েন্স পার্ক সাজানো হয়েছে | খুব সুন্দর | কিন্তু কিছুতেই আমি আমার আগের দুর্গাপুরকে পাইনা | এতে আমার কিছু করার নেই | আমি কিছুতেই আমার পুরোনো দুর্গাপুর থেকে বেরতেই পারিনা | টাউনশিপের কোয়ার্টারগুলো অনেক ভেঙেচুরে গেছে হয়তো কিন্তু আমার সেই ভাঙাচোরা দুর্গাপুরটা যেন আমায় পাগলের মত ডাকে | চূড়ান্ত ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় আজকাল খুব বেশি যাওয়া হয়না | পরিচিত দুর্গাপুরটাও গত কয়েক বছরে অনেকটা অপরিচিত হয়ে উঠেছে | আত্মীয়দের সাথে ফোনে-ফেসবুকে যোগাযোগটাই যা আছে | তাদের সংখ্যাও প্রকৃতির নিয়মে কমতির দিকে | তবু কখনও সখনও এয়ারপোর্টের মোড়ে দুর্গাপুর লেখা বাস দেখলে মনের মধ্যে সেই চাঁপা ফুলগুলোর নরম শরীর টের পাই | জানিনা গাছটা আজও আছে কিনা | ফুলগুলো আজও ফোটে কিনা |

মাথার মধ্যে আর একটা জায়গার কথা খুব বেশি করে ভেসে ওঠে | দুর্গাপুরের কাছেই | সেটা আমার, একান্ত আমার আসানসোল | হাটন রোড, চেলিডাঙ্গা, ঘাঁটি গলি, মুরগাসোল, ঊষাগ্রাম, মহিশীলার ম্যাজিক মাখানো আসানসোলের গল্প অন্যদিন বলব | আজ নয় | Wo kahani fir sahi.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s