কয়লাকুঠী

স্কুলে পড়ার সময় প্রায় প্রত্যেক বার পুজোর পর একটা কান্ড হত | দশমী চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে প্যাকিং শুরু হত | লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন আমরা সবাই মিলে গিয়ে উঠতাম আসানসোলে | দুর্গাপুর যাওয়ার মতই জার্নিগুলো ছিল তবে আর একটু লম্বা মানে আরও এক বা দেড় ঘন্টা বেশি | যখন থেকে এক্সপ্রেসওয়ে হল তখন থেকে মজাটা আরও বেড়ে গেল | শিয়ালদা-আসানসোল ইন্টারসিটি হওয়ার পর থেকে মজাটা পুরোপুরি স্বর্গীয় হয়ে উঠল | ইন্টারসিটি দুর্গাপুর ঢোকে সন্ধে আটটা নাগাদ | তারপর ওয়ারিয়া, অন্ডাল, রানীগঞ্জ পেরিয়ে কালীপাহাড়ি হয়ে আসানসোল ঢোকে | কালীপাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেনটা মোটামুটি যেন কোলিয়াড়ির মধ্যে দিয়ে ছোটে | দুপাশে কয়লার স্তুপ | মাঝখান দিয়ে ফাটিয়ে ছুটছে ইন্টারসিটি | এরকম দেখলেই আমার মনটা দুর্দান্তরকম ভাল হয়ে যেত | বাতাসে ভেসে বেড়ানো কালচে কয়লামাখা সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেটেড ম্যাটার ভালবাসা হয়ে আমার নাকে-মুখে এসে লাগত | বুঝতাম এসে গেছি আমার আসানসোলে | যেখানে ঘাঁটিগলিতে লিট্টি পাওয়া যায় আর রাস্তাগুলোয় চড়াই-উৎরাই আছে |

ভ্রমণ সঙ্গী আসানসোলকে কয়লাকুঠী নাম দিয়েছে | নামটা দুর্দান্ত |  কয়লাকুঠীই বটে | ঝাড়খন্ড লাগোয়া কোলিয়াড়ি অঞ্চল | খাদানে খাদানে ভরা | ছোটবেলা থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিওগ্রাফিতে আসানসোলকে শিল্পে জমে থাকা অঞ্চল বলেই জেনেছি | তবে বইয়ের জ্ঞানটা শুধু পরীক্ষাতেই কাজে লাগত যদি না ছোটবেলা থেকে বারবার আসানসোল যেতাম | দুর্গাপুর মায়ের তরফ, আসানসোল বাবার দিক | তবে একটা অ্যাঙ্গেল থেকে | পরিবারের পৈতৃক একটা শাখা বিশেষ কারণে আসানসোলে গিয়ে সেটল করে | কারনটা হল আমার এক দাদুর রেলের চাকরি | আমার নিজের ঠাকুরদা নন | ঠাকুরদার জ্ঞাতি ভাই | প্রথম পক্ষের স্ত্রী বেশ কয়েকজন সন্তানকে রেখে মারা যান | উনাকে আমি দেখিনি | দাদু দ্বিতীয় বার বিয়ে করেন | দিদা ছিলেন নাটোরের কোনও এক জমিদার বাড়ির পূর্বতন নায়েবের মেয়ে | সেই নায়েবকে দুটো কারণে শতকোটি প্রণাম | প্রথমত কি ভেবে তিনি তার মেয়েকে এই অভাবের সংসারে দিয়েছিলেন | দ্বিতীয়ত ভাগ্গিস দিয়েছিলেন নইলে দুপক্ষের প্রায় দশজন সন্তান জানতেও পারতনা যে মা বলতে আসলে কি বোঝায় |

দিদা একেবারেই মা দূর্গা ছিলেন | দুই হাতে দশ হাত এর কাজ করতেন | একটা বিরাট সংসার যেটাকে ভালবেসে রাবনের বাপের গুষ্টি বলা যায় সেটাকে নিজের দমে রোজ শাসন, শোধন ও পালন করে গেছেন | কাউকে মারতে হয়নি, ধরতে হয়নি, গালি দিতে হয়নি | স্নেহের শক্তিতে রাজ্য চালানোর ব্যাপারটা বড় শক্ত | দিদা সারাজীবন এই কঠিন কাজটা বড় সহজে করে গেছেন | বড়ে আরামসে | তো সেইযে বললাম লক্ষীপুজোর আগের দিন আসানসোলে গিয়ে পৌঁছতাম সেটা যতটা পুজোর টানে ঠিক ততটাই দিদার টানে | আর একটা টান আমাদের ছিল | মানে আমার আর বোনের | দুর্গাপুর থেকে পিসতুতো দাদা আর বোন এসে জুটত | লক্ষ্মীপুজোর দিন হইহই কান্ড, রইরই ব্যাপার, সাথে সন্ধেবেলা বাজি পোড়ানো ও ফাটানো | দ্বিতীয় ব্যাপারটার জন্যে অনেকবার বকা খেয়েছি | তবে গায়ে মাখিনি | মোটামুটি এক প্যাকেট চকলেট বোম ফাটাতাম আমি আর দাদা | প্যাকেট চারেক কালী পটকা | গোটা কুড়ি আলু বোম | সন্ধে বেলায় কাতারে কাতারে লোক আসত | দেবভোগ্য খিচুড়ি আর স্বপ্নের পায়েস খেয়ে যেত | জীবনে আর কোথাও কোনোদিনও ওই খিচুড়ি আর পায়েস আমার কপালে জোটেনি আর জুটবেওনা |

অত আত্মীয়-স্বজন থাকা সত্ত্বেও কিন্তু আমরা ম্যাক্সিমাম টাইম হোটেলেই থাকতাম | আসলে কারও বাড়িতে গিয়ে উঠলে তাদের সমস্যা হতে পারে সেটা ভেবেই সাধারনতঃ আমরা ঘাঁটিগুলিতে রাজর্ষি হোটেলে থাকতাম | একবার হয়তো ভ্যালি ভিউ তে ছিলাম | রাজর্ষি হোটেলটা আমার স্বপ্নের থেকেও সুন্দর | রিসেপশন পেরলে একটা খুব বড় ফাঁকা জায়গা | চারদিকে ঘরগুলো | পুরো এরিয়াটা সাদা রঙের | মাঝখানে একটা সাদা জলের ফোয়ারা | ওই বয়সে আমার ওই জায়গাটা দুর্দান্তরকম ভাল লাগত | বাইরে বেরিয়ে পাশেই একটা বাজার | যেখান থেকে মা লক্ষ্মীপুজোর সকালে পদ্মফুল কিনে মহিশীলাতে দিদাকে নিয়ে গিয়ে দিত | দিদার মুখে একটা “ইউ হ্যাভ মেড মাই ডে” স্মাইল ফুটে উঠত | যে বাড়ির কথা এতক্ষন বললাম সেই মহিশীলা কলোনির বাড়িতে একটা বিরাট কুয়ো ছিল | যাকে আসলে ইঁদারা বলে | বড়, বাঁধানো, কপিকল ওয়ালা |

সেই ইঁদারার পাশে একটা ফাটাফাটি স্থলপদ্ম গাছ ছিল | হয়তো এখনও আছে | অনেকদিন যাওয়া হয়নি | গোলাপি রঙের ফুলগুলো হাওয়ায় দুলত | পুজোতেও লাগত | সেই কুয়োর ঠান্ডা জলে আমি অনেকবার স্নান করেছি | বাড়িটা আজও আমায় কথায় কথায় হন্ট করে চলেছে | বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসেই একটা প্রকান্ড গাছ | বট বা অশ্বথ্ব হবে | নীচের দিকটা বাঁধানো | অনেকলোক সেখানে বসে বাসের জন্যে ওয়েট করত | পাশেই রিকশা স্ট্যান্ড | সেখান থেকে রিক্সা নিয়ে আমরা ঘাঁটিগুলিতে ফিরে আসতাম |

আসানসোল আধা বাঙালি আধা বিহারি শহর হওয়ায় কালচারটা একটু অন্যরকম ছিল | খাবার হোটেলগুলোতে আবার কুকরা অনেকে বাঁকুড়ার লোক হওয়ায় রান্নাতেও একটা মিলিজুলি প্রভাব ছিল | বিউলির ডাল আর আলু দিয়ে ঝোলা পোস্ত তো আছেই | মাছ, মাংস, তরকা সবকিছুতেই তরকারিগুলো একটু বড় বড় করে কাটা | আমার রাতে রুটি-তরকা খাওয়া হয়তো ওখানেই প্রথম | তরকাতে বেশ টমেটো, কাঁচা লঙ্কা দেওয়া থাকত | উপরে ধনেপাতার গার্নিশিং | ওই যে তরকার নেশা লেগে গেল, সেটা আজও ছাড়েনি |এখনও ধাবায় গাড়ি থামলে তরকা বলে হাঁক দিই | ঘাঁটিগলিতে বেশ কিছু জায়গায় লিট্টি বিক্রি হয় | অনেকে লিট্টি-চোখা খেতে খেতে ভোজপুরি গান শোনে | বহিয়া মে তু হামরি সমাজা গোরিয়া, কুছ কুছ হোলা ধরকেলা ইয়ে জিয়া | মানেটা সবাই বুঝতে পারবে | ভোজপুরি বলা বেশ টাফ | আমি চেষ্টা করেও পারিনা তেমন |

মহিশীলার বাড়ির সকলে ওই বাড়িতে উঠে যাওয়ার আগে পর্যন্ত চেলিডাঙ্গায় রেল কোয়ার্টারে থাকত | বড় পিসিমনি বিয়ের পর থেকে ঘাঁটিগলিতেই | বহুবার গেছি সেই বাড়িতে | ঘাঁটিগলির পরিবেশটা চিরকাল আমায় বড় বেশি টানে | বিশেষ করে গলি থেকে বেরিয়ে হাটন রোডের দোকানগুলো | কত রকমের জুতো পাওয়া যেত বা যায় | আমি অনেক সময় একাই ঘুরে বেড়াতাম আর ওই বাজারটা পাঁচ-সাতবার চক্কর মারতাম | থানার কাছে হয়তো এখনও সেই দারুন ছোলা-ভটুরাটা পাওয়া যায় | শীতের শুরুতে পাতলা কম্বল নিয়ে সওদা করে দোকানিরা | একবার অফিস ছুটি না পাওয়ায় আমি দিদির বিয়েতে যেতে পারিনি | মা একটা কম্বল নিয়ে এসেছিল | সেটা এখনও আমি গায়ে জড়াই | মনে আছে মহিশীলা ছাড়িয়ে আরও এগোলে ঊষাগ্রামের দুর্গাপুজোর ঠাকুর অনেকদিন থাকত | লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনের সন্ধেয় আমি সে ঠাকুর দেখেছি সবার সাথে | এমন আশ্চর্য ছিল আমার আসানসোল |

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s