বকদ্বীপ

বহুদিন হল বকখালি যাইনা | বন্ধুরা মিলে একবার দীঘা গেছিলাম ঘুরতে | সেবার ফিরে আসার পর ভ্রমণে একটা লেখা পড়ি | নবরূপে বকখালি | লেখক অচিন্ত্য আইচ | এমনিতে দেখবে কোথাও থেকে ঘুরে আসার পর আবার কোথাও একটা যেতে খুব ইচ্ছে করে | তো সেই লেখাটা পড়ে আবার এরকম একটা ইচ্ছে মাথার মধ্যে বেশ কায়েমী হয়ে উঠল | কিন্তু তখনই যাওয়া হলনা | প্রায় বছর খানেক পরে প্রথমবার বকখালি গেলাম | তারপর থেকে সাকুল্যে ছ-বার গেছি | লোকে এখন মজা করে বলে ওটা নাকি আমার সেকেন্ড হোম | কিন্তু কেন বকখালি? কি আছে ওখানে যে ছ-বার যাওয়ার পরেও আমার এখনও মোহ কাটলনা ? এই প্রশ্নগুলো উঠতে পারে | ছোটবেলায় কনসেপ্ট অতটা ক্লিয়ার ছিলোনা | এক হতভাগা বকখালিকে বকদ্বীপ বলত | কিছুই বুঝতামনা | জায়গাটা কোথায়? কিভাবে যেতে হয় কিছুই জানতামনা | যেদিন জানলাম সেদিন থেকে সে পথে আমি গেছি বার বার | বকখালিতে বারবার কেন যাই, সেটাই বলার চেষ্টা করছি |
বকখালি সুন্দরবনে | বলতে গেলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার শেষ প্রান্তে | অন্তত ওই লাইনে | ট্রেনে বকখালি যেতে হলে নামখানা পৌঁছতে হয় লোকাল ট্রেনে | এক্সপ্রেস ট্রেনের সুবিধা নেই |বাসে যাওয়া যায় কিন্তু সে বড় খাটনি | গাড়িতে গেলেও একটু ঝামেলা | শিয়ালদা থেকে নানা স্টেশনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে নামখানা লোকাল প্রায় তিন ঘন্টা লাগায় নামখানা ঢুকতে | কাকদ্বীপ স্টেশনের পরেই ছোট নদী দেখতে পাওয়া যায় | নদীর উপর রং-বেরঙের মাছধরা ট্রলার | তবে ট্রেনের গতির জন্যে এক ঝলকই দেখা যায় | তখনই মনটা ভালো হয়ে যায় | কাকদ্বীপের পরের স্টেশন উকিলের হাট | হাটে উকিল বিকোয় কিনা জানিনা | এ নামের উৎস সন্ধানে যায়নি কখনও | পরিবারে যথেষ্ট উকিল থাকলেও উকিলদের ধার মাড়াতে খুব একটা ইচ্ছে কোনোদিন হয়নি | আজকাল অবশ্য নিজের পেশাগত কারণে উনাদের সান্নিধ্যলাভ হচ্ছে অবরে-সবরে | উকিলের হাট স্টেশনের পরেই নামখানা | এ লাইনে এখনো অবধি শেষ স্টেশন | নামখানা থেকে ভ্যান-রিক্সায় ফেরিঘাট যেতে হয় | নদীর নামটা খুব মজার | হাতানিয়া-দোয়ানিয়া | ফেরিঘাটটা দেখে গল্পে পড়া গোয়ালন্দ স্টীমার ঘাটের কথা মনে পড়ে যায় | যদিও সেটি দেখিনি কখনো |
বড় বড় মাছধরা ট্রলার | লাল, নীল, কমলা | ঘাটে ঢোকার মুখে খাবারের হোটেল | একটা দারুন মিষ্টির দোকান আছে | শীতকালে ফাটাফাটি নলেন গুড়ের রাজভোগ বানায় | ওটা আবার গুড়ের জেলা কিনা | খেজুরের রস থেকে শীতকালে একঘর গুড় তৈরী হয় | এই গুড় তৈরির জীবন নিয়েই নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প রস | পরে সুধেন্দু রায়ের বিখ্যাত সিনেমা সওদাগর বানানো হয় এই গল্প থেকেই | শুটিং হয়েছিল কামদুনিতে | যেটা উত্তর চব্বিশ পরগনাতে | আসলে সাবেক চব্বিশ পরগনা থেকেই উত্তর ও দক্ষিণ হয় | তাই দুই পরগনাই মোটামুটি একরকম |
হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরতে হয় ভটভটি নৌকায় | গাড়িতে এলে বার্জে পেরতে হয় | ভাসমান বার্জ বা ভেসেলে গাড়ি উঠে যায় , এমনকি বাস-ও | ভেসেলটা সবসমেত নদী পেরিয়ে যায় | তারপর বকখালি আর ২৫ কিলোমিটার | বাস আছে | গাড়ি ভাড়া নেওয়া যায় | ফ্রেজারগঞ্জের এরিয়া পেরিয়ে সোজা বকখালি বিচ | প্রথম বার মাত্র একরাত ছিলাম | একদম ফাঁকা একটা বিচ কতটা অসামান্য সুন্দর হতে পারে সেই অভিজ্ঞতাটা প্রথম বার হয়েছিল | কেমন যেন বিষন্ন | ব্রেক-আপের পর প্রথম প্রথম মেয়েদের আর পরের দিকে ছেলেদের যেমন হাবভাব হয়, সেরকম |সামনে বকখালি অবধি ট্রেন যাবে |হাতানিয়া-দোয়ানিয়াতেও ব্রিজ হয়ে যাবে |
এই একলা-পনাটাই বকখালিতে আমায় বার বার টেনে নিয়ে যায় | বিচে দাঁড়িয়ে যখন দেখি সামনের ফাঁকা সমুদ্রের সাথে ফাঁকা বিচটা একদম মিশে গেছে তখন মনে হয় কোথাও গিয়ে এই স্পেসটা আমার দরকার ছিল | আমার বকখালি আমায় এই স্পেসটা দেয় | বিচটা কিন্তু হলদে বালির নয় | বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলটা খাঁড়ি-ঘেঁষা | বিচটা সাদা বালি আর পলিমাটি মেশানো | একটু hardy, দিঘার মত পাড় উপচে আসা ঢেউ নেই এখানে | অনেক নিথর, অনেক নিস্পন্দ সমুদ্র | বিচ জুড়ে লাল কাঁকড়াদের কলোনি | দূর থেকে দেখলে মনে হয় লাল চাদর হাওয়ায় দুলছে | এই লালিদের সাথে ছুটে ছুটে আমার অনেক সময় গেছে | কোনোদিন একটাও ধরতে পারিনি | তাড়া করলেই এরা ছুটে গর্তে ঢুকে পড়ে | আসলে বিচের নিচে এদের একটা অন্য পৃথিবী আছে | গর্তের পর সুড়ঙ্গ টাইপ পালাবার জায়গা আছে | তবে বালি খুঁড়ে বের করা যায় | একবার আমার ভ্যানওয়ালা দাদা বালি খুঁড়ে একটাকে বের করে দেখিয়েছিল | এদের একটা আলাদা মানসিকতা, একটা আলাদা দর্শন | কাউকে ধরা দিতে চায়না | মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় | আমার মতো | আমিও তাই বেরিয়ে যাই, সঙ্গী আমার এই কালরাত্রিটাই | রূপমের গানটা আমাদের জন্যই হয়তো | আমরা ফ্রি-জোনের জীব |
পালতোলা নৌকো, পালছাড়া ভটভটি আর জেলেদের ডিঙিগুলো ভেসে বেড়ায় | মাছ ওঠেতো অনেক | বাজারে গেলেই দেখা যায় | তবে ফ্রেজারগঞ্জ হল মাছের আড়ত | সেখানে হারবারে ট্রলার ভেড়ে | মাছের নিলাম হয় | বকখালি আমায় সস্তায় সর্ষে ইলিশ আর গরম ভাত সাজিয়ে দিয়ে যত্ন করে খাওয়ায় | তা সেখানে যাবনাটা কেন ? মাঝারি সাইজের ইলিশের পিস | কাঁচালঙ্কা আর সর্ষে দেয়া gravy | গরম ভাতে খেতে খেতে মনে হয় এটাই বঙ্গোপসাগর মন্থন করে পাওয়া অমৃত | এই খাবারের আসল জায়গা রাস্তার ধারের খুব সাধারণ মানের হোটেল | যেখানে চেয়ার-টেবিল গুলোও standard নয় | শুধু রাঁধুনি-দিদির হাতের গুনে আর দাদার পরিবেশনে পুরো ব্যাপারটা স্বর্গের মত হয়ে যায় |এই বকখালির স্বাদ আমায় কোনোদিন গোয়া বা মায়ামি দিতে পারবে না | দুটোর কোনোটাতেই না গিয়ে বলছি | বকখালিকে আমার মন থেকে মুছতে পারে এমন কোনো মাই কা লাল হয়নি |
বিচের উল্টো ধারের রাস্তা ধরে গেলে হেনরিজ আইল্যান্ড | গোটা একটা দ্বীপে হাত ধরাধরি করে মাছ ধরাধরি চলছে | দ্বীপের সর্বশেষ বিন্দু হল কিরণ বিচ | সাধারণত যখন কিরণ বিচে গিয়ে নামি তখন আমি, আমার ভ্যানওয়ালা দাদা আর লালিরা ছাড়া কেউ থাকেনা | এমন নৈঃশব্দের উৎসব ছেড়ে কেউ অন্য কোথাও যায়? কিরণ বিচে দাঁড়ালে মনে হয় যেন আমার caste – away condition চলছে | মাস্তুল ভেঙে জাহাজ ডুবেছে আর আমি সংকর মাছের লেজ ধরে ডাঙায় পৌঁছে কোনোভাবে বেঁচে গেছি | সাদা বালি মেখে মুখ থুবড়ে পরে আছি বিচে | কাঁকড়াগুলো শরীরের উপরে উঠে বুঝতে চাইছে এ আমাদের শত্রু না বন্ধু | গাছের ভাঙা ডাল, ম্যানগ্রোভের বন যেন একটু সন্দিহান আমায় নিয়ে | হয়তো তারাও ভয় পায় | তবে সময় এগোলে এরা সবাই বোঝে আমিও এদের মতই একজন | শুধু তফাৎ একটাই | ওদের দিনরাত মোটামুটি এক | আর আমার জীবনে এই সুখের নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী মাত্র | কয়েক লহমা পরেই আবার আমায় নামখানা থেকে ট্রেন ধরতে হবে |
যে রাস্তার কথা বললাম সেটা এখন কংক্রিটের | আগে যখন ইঁট বাঁধানো ছিল তখন একবার বন্ধুরা মিলে কিরণ বিচ থেকে ফিরছিলাম ওই রাস্তা ধরে | সবাই মিলে ভ্যানে | গ্রাম-চেরা রাস্তা | তখন সবে সন্ধে নেমেছে | অন্ধকার, মাঝে মাঝে বাড়িগুলোর টিমটিমে আলো | সৈকত ভ্যানে বসে বসে গাইছিলো, এ কি লাবণ্যে | ওই রাস্তায় ওই অন্ধকারে ওই সময় ওই নিষ্পাপ গলায় ওই গান | কেমন লেগেছিল বলবনা | বুঝবেনা তুমি | ঠিক ওইভাবে একদিন গানটা শোনো তবে বুঝবে | সেবার ফ্রেজারগঞ্জ হারবার থেকে ২০ টাকায় ২ কিলো লোটে মাছ কিনে ৫০ টাকা দিয়ে চপ বানানো হয়েছিল | সন্ধেয় মুড়ির সাথে দেদার চপ | তাও অন্ধকারে টেবিল পেতে বসে | রাতে বিচে গিয়ে গান শুরু হল | প্রায় দশটার সময় দুজন পুলিশ এসে আমাদের উঠে যেতে বললেন | রানা পুলিশদের কাছে অদ্ভুত আবদার করে বসল | “আর দুটো গান গাইব, গেয়েই উঠে যাব |” পুলিশরা আর কিছু বলেননি | আচ্ছা বলো দেখি, নিজের গায়ে এরকম পাগলামির বালি মাখতে আর কোথায় যাব আমি? বকখালি ছাড়া ?
DSCN2420_FotorDSCN2415_FotorDSCN2397_FotorDSCN2329_FotorDSCN2352_FotorDSCN2369_Fotor
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s