ময়নামতির দিকশূন্যপুর

সেবার শীতকাল এসেছে বেশ রসিয়ে | কলকাতায় ঠান্ডা পড়েনা এই আকাশ-কিসিং মিথটায় কয়েকদিনের জন্য চিড় ধরেছে | সেই মিথকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম | কলকাতায় সঙ্গী ছিল শীতঘুম, ট্রেন থেকে নামতেই গলা জড়িয়ে হামি দিল পূর্ব সিংভূম | ঝাড়খণ্ডের এই জেলাটি এক্কেরে রূপসী কন্যা | যার চোখের ইশারায় যে কেউ কোনও প্রশ্ন না করে পিছন পিছন  হা-ক্লান্ত দৌড়বে | ঝাড়খণ্ডের সোহাগ নিতে ঘাটশিলা পৌঁছেছি | ইচ্ছে দিন-দুয়েক থেকে মনটাকে একটু সবুজে স্নান করিয়ে নিয়ে যাই | বড় বেয়ারা ধুলো জমে আছে | পুরনো শহর | টাউন বলে ডাকলেই হয়তো খোকার সঠিক গ্রেডেশন হবে | বনফুল, বিভূতিভূষণের গল্পে পড়া পাথুরে পশ্চিম |বইয়ের পাতায় ফসিল হওয়া পোকা হয়তো আসলে সৌন্দর্যে পাগল হয়ে মরেছে |

বুরুডি লেক যাওয়ার রাস্তায় বেশ কিছু সাঁওতাল বস্তি | হেইজুমে (এদিকে এস ) শুনে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম | দাঁড়াতেই দাদা খাটিয়ার দিকে দেখিয়ে বললেন দুরুম্মে (বস) | দড়িতে বোনা সলিড খাটিয়া | বসে পড়লাম | মা মুরগি পাড়া বেড়াতে বেরিয়েছে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে | মুরগিদের বার্থ কন্ট্রোল নিয়ে এখনও আইন আসেনি | এই কিস্কু, মার্ডি, সরেনদের পাড়ায় আতিথেয়তায় গরম করা চা গলা দিয়ে নামাতেই ঘাটশিলা মোটামুটি ভালবাসার সাত ঘাটে নাইয়ে দিল | মুগ্ধ্তা কাকে বলে ? হয়তো একেই | সিমেন্ট আর মাটি দিয়ে বানানো সাঁওতাল ঘরবাড়ি | কোথাও অযত্ন, অবহেলা নেই | টকটকে নীল দেয়াল আর কালো দাওয়াগুলোকে ক্যাডবেরি মিষ্টি রোদ ঝকঝকে করে রেখেছে |

ফুলডুঙরি আর নেকড়েডুঙরির দেশে বুরুডি লেক হয়তো সবথেকে অভিনব | পাহাড়ে-জলে  মিলেমিশে একটা জমাট পাগল-পন্থী | শাল আর কাজু গাছের ঘুম ঘুম জঙ্গল | লেকের সামনে ছোট দোকান | বেগুনী দেখে আর পায় কে? বেগুনী এল শালপাতার উপর | শুকনো পাতার উপর নয়গো | কাঁচা, সবুজ পাতার উপর গরম বেগুনী, উপরে বিট-নুনের মোম-পালিশ | ঈশ্বর তুমি এখানে এভাবে ধরা দিলে? তোমায় এভাবে পাওয়ার পরে তো বুরুডির জলে মরেও সুখ | একেবারে কালো জলে কুজলা তলে ডুবল সনাতন |

যেখানে কপারের মাইন আছে সেই জায়গাটার নাম কে মৌভাণ্ডার রেখেছে জানিনা | যার মাথা থেকে এরকম একটা নাম বেরিয়েছে তাকে ভালবেসে উন্মাদ বলা ছাড়া উপায় নেই | শব্দটা শুনলে মনের ভেতর সুবর্ণরেখা উছলে ওঠে | ব্রিজের উপর থেকে দেখতে পাওয়া সুবর্নরেখার বেশ কিশোরী কিশোরী ছলছলানি | এ নদী নিশ্চই শাহরুখের ফ্যান, তাই সবসময় রোম্যান্টিক | আসলে এই নদী, এই পাহাড় আর মহুয়ার গন্ধের মাতলামিটা মিশে যে সর্বগ্রাসী নেশাটা মাথায় মধ্যে ছড়িয়ে যায় সেটাকে তরল করলে যে মৌ বা মধু বোতলে জমা হবে, এই ভান্ডারটা তাতেই ভরে আছে |

বিভূতিবাবুর জায়গা এটা | বনগাঁর লোক আদতে | আমারই জেলা | কলকাতা থেকে কেন বারবার ছুটে আসতেন আর কেন এখানে বাড়ি করেছিলেন সেটা এখানে না এলে বোঝা যাবেনা | বিভূতিবাবুর লেখা বিখ্যাত গল্প রঙ্কিনী দেবীর খড়্গ যে দেবীকে নিয়ে লেখা তাঁর অধিষ্ঠান যাদুগোড়ায় | পাহাড়ি পথে একটু উপরে উঠতে হয় | অসম্ভব সুন্দর মন্দির | এই এলাকার শক্তির প্রতীক রূপে পূজিত হন দেবী রঙ্কিনী | আমাদের মা কালীর মত | মন্দিরের গায়ে নানা লোক নানা কিছু চেয়ে দড়ি বেঁধে যায় |

একপ্রস্থ ঝাড়খণ্ডী লাল ধুলো মেখে যখন ঘাটশিলা থেকে টিটলাগড় ধরছি তখন ব্যাগটাকে বড্ড বোঝা মনে হল | আরেকদিন থেকে যাব? উপায় তো নেই | তাহলে আবার আসতে হবে |সেবার আর একটু বেশি দিন | ততদিন মা রঙ্কিনী ভাল রাখুন ঘাটশিলাকে |

“চলো যাই , ওই লাল ধুলো পায়ে মেখে আজ না হয় হলাম একটু পরিশ্রান্ত । তারপর ??? তোমার জন্য সাজিয়ে রেখেছি আমার রঙ্গীন শান্তির ছোট্ট নীড় !!! যাবে আমার সাথে ???”——- এক বর্ষা ভেজা জলপিপি |

 

IMG_4456_FotorIMG_4480_FotorIMG_4490_FotorIMG_4516_FotorIMG_4607_FotorIMG_4651_Fotor

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s