রুমটেক

রাতে ঠিক হয়েছিল যে ভোরবেলা ব্যালকনি থেকে যদি আকাশের কোণে সোনালি রঙের রাংতাটা দেখা যায় তো চট করে হোটেলের নীচ থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা তাশি ভিউ পয়েন্টে চলে যাবো | কারণ ওটাই আমাদের গ্যাংটকে শেষ দিন | যদি কাঞ্চনের একটু ভালো ছবি আসে | ভোরবেলা কিন্তু কাঞ্চন মেঘ সরিয়ে সামনে এলনা | ফলে আমরা সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়ে যেখানে এম.জি.মার্গের সাথে টিবেট রোড এসে মিশেছে সেখানে পৌঁছে একটা বিহারী দোকানে পুরি-তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট খেলাম | তারপর একটু হেঁটে এসে একটা ট্যাক্সিতে উঠে এগোলাম রুমটেকের দিকে | আমার ছোটবেলার গ্যাংটক ভ্রমনের সময় এক বিকেলে রুমটেক গেছিলাম | এবার সময়ের এত অভাব ছিল যে রুমটেক প্রায় যাওয়া হয়না আর কি | বারোটায় হোটেল ছাড়তে হবে | ট্যাক্সি আমাদের নিয়ে সাড়ে দশটায় নীচে নামতে শুরু করল |

দেওরালি পেরিয়ে ট্যাডং হয়ে নেমে একসময় ডানদিকের রাস্তা ধরলাম | রুমটেক একেবারে অন্য একটা পাহাড়ে, রাস্তা বেশ খারাপ | গাড়ি জোরে চলায় আমরা ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোচ্ছি | ঝাঁকুনি খেতে খেতেই পৌঁছে গেলাম রুমটেকের গেটে | রুমটেক মনাস্ট্রি | কগয়ু বৌদ্ধদের ইন্টারন্যাশনাল হেড কোয়ার্টার | গেটে ভোটার আই ডি কার্ড দেখিয়ে কয়েক মিনিটের খাড়াই উঠে মনাস্ট্রি | খাড়াই বেয়ে যত ওপরে উঠছিলাম তত গম্ভীর গলায় তিব্বতি মন্ত্রোচ্চারণ কানে ভেসে আসছিল | আজ কোনও একটা বড় কনভেনশন আছে | রুমটেকে দেশ-বিদেশ থেকে অতিথিরা আসেন, পর্য্টকরা আসেন , বৌদ্ধদের সভা-টভা বসে, কখনও লামা ড্যান্স হয় | রায়বাবুর গ্যাংটকে গন্ডগোল যারা পড়েছে এসব তারা জানে | তো সেদিনও এরকম একটা সভা ছিল | স্তোত্রপাঠ হচ্ছিল |

আমরা আস্তে আস্তে গোল্ডেন স্তুপে গিয়ে ঢুকলাম | আমাদের সাথে সাথে ঢুকল ভূটান থেকে আসা একদল কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে | সুন্দর সুন্দর ভূটানি ট্র্যাডিশনালস পড়া | তারপর সবাই মিলে প্রণাম শুরু করল ষোড়শ কর্মপা রনজং রিগপে দোরজির স্মৃতিতে | আমরাও করলাম | তারপর বেরিয়ে এলাম |গোল্ডেন স্তুপের সামনেই লামাদের থাকার জন্যে একটা খুব সুন্দর বাড়ি আছে | সেখানে বেশ ছবি-টবি তুলে নীচে চলে এলাম | স্তুপের ভেতরে ছবি তোলা বারণ | দুজন লামাকে অনুরোধ করে আমিও তাদের সঙ্গে নিজের একটা ছবি তুলে নিলাম | তারপর চললাম ধর্মচক্র সেন্টারে | এতক্ষনে স্তোত্রপাঠ থেমেছে, সভা ভেঙে গেছে | মানুষজন মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছে | আমরা ঢুকে পড়লাম | সারি সারি গালিচা পাতা | সেখানে কিছু লোক তখনও বসে আছে | এখানেও ছবি তোলা বারণ |

রুমটেক কেন বারবার হাত ছড়িয়ে ডাকে সেটা এই মন্দিরে এলে বোঝা যায় | অপার শান্তি প্রত্যেকটা কোণায় | জীবনে নানাভাবে জর্জরিত মানুষের অন্যতম শান্তির আশ্রয় রুমটেক | আমার তো তেমনটাই মনে হয় | সেদিন যদিও ভীড় ছিল | ফাঁকা থাকলে শান্তিটা আরো বেশি ফিল করা যেত | বাইরে বেরিয়ে অনেক ছবি তুললাম | তারপর উৎরাই পথ ধরে নামতে নামতে একটা দোকানে তিব্বতি ধুপ কিনলাম | এই ধুপটা আমার খুব পছন্দের | গেট পেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম | কিছুক্ষন পরে ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো একটা চায়ের দোকানে | সেই দোকানের পাশে একটা খুব সুন্দর ভিউ-পয়েন্ট বানানো আছে | উল্টোদিকের গ্যাংটক তো বটেই একেবারে সংমো লেকের এরিয়াটাও দেখা যায় | অসাধারণ ভাল ছবি এল | তারপর  চা খেয়ে নিয়ে যখন হোটেলে ফিরলাম তখন পৌনে-বারোটা বাজে | এবার শিলিগুড়ি নামতে হবে |

এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাটা পড়ে যদি তোমার একটুও ভাল লাগে তবে আমার অনেকটা ভাল লাগবে | লেখাটা একটু রায়বাবুর মত হয়ে গেল | আমিও তো রায় | এটা সেই প্রবাদ-প্রতিম এস. রায়কে একটা ছোট্ট শ্রদ্ধাঞ্জলি, এই নগন্য এস. রায়ের দেওয়া |

IMG_6826_FotorIMG_6819_FotorIMG_6811_FotorIMG_6830_FotorIMG_6838_FotorIMG_6840_FotorIMG_6845_FotorIMG_6849_FotorIMG_6852_Fotor

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s