বাসন্তী কালিম্পঙ

শীত কমতে কমতে যখন প্রায় শেষ হয়ে যাবে যাবে, ঠিক তখনই পলাশ আর শিমুল ফোটে | খয়েরি ডালে ডালে লাল বা হলুদ ফুল | গাছের নীচে স্তুপ হয়ে যাওয়া পাঁপড়ির শরীর | শন শন হাওয়া বুঝিয়ে দেয় এই সেই বসন্ত | সজনে গাছগুলো হলুদ ফুলে ভরে যায় | আমের ডালে মুকুল আসে আর মধুর লোভে আসে মৌমাছি | এমন এক দিনে বেলা-বেলি চড়ে বসলুম গাড়িতে | সেবক রোড ধরলে শিলিগুড়ি থেকে সেবক মাত্র ২২ কিলোমিটার | সেবকেশ্বরী কালীমাতাকে প্রণাম ঠুকে, বিখ্যাত বাঘপুল মানে করোনেশন ব্রিজকে ডানদিকে রেখে এগোলাম সামনে | নীচে গাছের ফাঁক থেকে উঁকি দিতে দিতে সঙ্গ নিল তিস্তা | সবজে জলের ধারা | মাঝে মাঝে পাথরের গা ভিজিয়ে কেমন ফুর্তিতে চলেছে | এগোতে এগোতে একসময় পেরিয়ে গেলাম তিস্তা ব্রিজ | তারপর মাইলস্টোনগুলো গুনতে গুনতে আর সবুজ পাহাড়ের আদর খেতে খেতে আমার গাড়ি উঠতে লাগল উপরে,.আরও উপরে | পাকদন্ডীতে পাক খাচ্ছি আর নীচে তিস্তার চরে লাল হয়ে আছে বিরাট বিরাট শিমুল গাছ | দিনটাও সরস্বতী পুজোর আগের দিন | পলাশপ্রিয়ার উৎসবে এগিয়ে চলেছি ফুলের শহর কালিম্পঙের দিকে |
কালিম্পঙ পৌঁছতে প্রায় বেলা তিনটে বেজে গেল | মোটর স্ট্যান্ডের কাছে হোটেল ঠিক করে মালপত্র রেখে বেরতেই বুঝতে পারলাম বেশ খিদে পেয়ে গেছে | কাছেই একটা ছোট দোকানে আরাম করে ভেজ মোমো খেয়ে নিলাম | দারুন মোমো | দোকানি দিদির ব্যবহারটিও বেশ | সেদিন বিকেল আর সন্ধে মোটামুটি শহরে হেঁটেই কেটে গেল | টেনথ মাইলের দিকে একটা ভালো কফির দোকান পেলাম | খুব ভালো কফি | এই অঞ্চলের প্রথমে নাম ছিল ডালিমকোট | পরে নামটা পাল্টে গিয়ে হয়ে যায় কালিবং | তারপর কালিবং যে কখন আস্তে আস্তে কালিম্পঙ হয়ে গেছে সেটা বলা মুশকিল | বহুকাল আগে কালিম্পঙ পর্যায়ক্রমে সিকিম ও ভুটানের অধীন ছিল | পরে ব্রিটিশের হাতে আসে | ব্রিটিশ-বঙ্গে কালিম্পঙ অন্যতম হিল-স্টেশন হিসেবে প্রখ্যাতি লাভ করে | পরবর্তীকালে পশ্চিম-বঙ্গের অন্তর্গত হয় কালিম্পঙ | আয়তনে বাড়তে থাকে শহর | আজ ডেলোর জলাধার, বেশ কয়েকটি চার্চ ও মন্দির, একটি মসজিদ, মোটর স্ট্যান্ড, স্টেডিয়াম ইত্যাদি নিয়ে কালিম্পঙ বেশ একটা গুছিয়ে বসা শৈলাবাস |পর্যটনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন এই শহর | এখন তো নিজেই জেলা হয়ে গেছে | একদিকে দার্জিলিং ও অন্যদিকে লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ | আবার তারই সাথে পেডং পেরিয়ে সিলারি হয়ে পথ গিয়েছে জুলুক | সেই ঐতিহাসিক রেশমপথ | রেশমের কারবার চলত এই বিখ্যাত পথে |
পরদিন সকালবেলায় একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সারা এলাকা ঘুরে দেখতে | ভ্রমণ শুরু হল গল্ফ কোর্স থেকে | সবুজ কার্পেটের মত মসৃন গল্ফ কোর্স | অসাধারন সুন্দর | ছড়ানো-ছিটানো | সেনাবাহিনীর বানানো জিনিস | কাজের অবসরে গল্ফ খেলো | খেলার অবসরে কফি বা চায়ে চুমুক দাও | একটু দূরেই মরগ্যান হাউস | বিখ্যাত বাংলো | এখন আমাদের রাজ্য পর্যটনের অতিথি নিবাস | পুরনো ঐতিহ্যের গন্ধে ভরপুর বাড়ি | দেখলেই ছবিতে দেখা ইংল্যান্ডের কথা মনে পড়ে | অনেক ফুল দিয়ে সাজানো বাংলোর লন | বসন্তের ফুলের মন-মাতানো সংকলন | আমার গাড়ি আবার এগিয়ে চলল | ভারতীয় সেনা দপ্তর পেরিয়ে সোজা চলে এলাম জং ডগ পালরি ফোব্রং গুম্ফায় | ১৯৩৭ সালে তৈরী এই গুম্ফার ডাকনাম দুরপিন মনাস্ট্রি | দুরপিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুম্ফা কারন এখানে দলাই লামার উপহার দেওয়া ১০৮ খন্ডের কাঞ্জুর গ্রন্থটি রয়েছে | তিনতলা মনাস্ট্রির একদম উপরে উঠলে কালিম্পঙ শহর আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় | যদিও আমার এই যাত্রায় কাঞ্চনদেবী দেখা দেননি | কুয়াশার একটু বেশি রকম আধিক্য ছিল |
দুরপিন থেকে আমার গাড়ি চলে এল চিত্রভানুতে | প্রচুর ফুল গাছে ভরা এই অসাধারণ কটেজটিতে রবি ঠাকুর এসে থাকতেন মাঝে মাঝে | বাড়িটি এখন নানা রকম কলার প্রশিক্ষন কেন্দ্র হয়ে গেছে | ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষেধ | পালসে পেন ভিউ নার্সারি | কালিম্পঙের সবচেয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধ নার্সারি এটি | পেন ভিউ এর ক্যাকটাস সত্যিই দেখবার মত | এখান থেকে গাছের চারা কেনা যায় | কালিম্পঙ এমনিতেই ফুলের শহর, নার্সারির শহর | পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ফুল যায় এখান থেকে | বসন্তে তাই এই নার্সারি গুলো মোহময়ী হয়ে ওঠে | রাস্তায় ফুল, পাহাড়ের গায়ে ফুল, বাড়িগুলোর রেলিঙে ফুলে ভরা গাছ | অজস্র অর্কিডের গাছ দেখা যায় বিভিন্ন নার্সারিতে | চলতে চলতে সরস্বতী পুজোর অঞ্জলির শব্দ কানে আসছিলো | কপাল গুনে পরের দিন আবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে | বসন্তে কালিম্পঙ একেবারে বাসন্তী |
এবার এগোলাম হনুমান টকের দিকে | পাহাড়ের উপর বিরাট বজরংবলীজির মন্দির | মূর্তির শিল্প সুষমা অসাধারণ | পাশে দূর্গা মন্দির, গনেশ মন্দির ও শিব মন্দির দেখা হল | পাহাড়ের গায়ে বানানো এই মন্দিরগুলো কালিম্পঙের অবশ্য দ্রষ্টব্য | এবার চলে এলাম গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তিতে | অসম্ভব সুন্দর মূর্তিটি | গৌতমবুদ্ধের প্রিয় গুরু পদ্মসম্ভবের স্থান | অদ্ভুত ব্যাপার হল যে বাংলা থেকে এক বাঙালি পুরুষ তিব্বতে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে | তখন তিব্বত বৌদ্ধ ধর্মের মূল প্রাণকেন্দ্র ছিলনা | তিনি ধর্মপ্রচারে এতটাই সফল হন যে পরবর্তীকালে অনেক বৌদ্ধ খানকে আর ফ্রেস্কোতে বুদ্ধদেব ও পদ্মসম্ভবের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মগুরুদের মুখের আদলে তাঁর মুখের মিল পাওয়া যায় | তিনি শ্রী অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান | এখনকার বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের এক বাঙালি বৌদ্ধ | পদ্মসম্ভবের মূর্তিটা দেখে এই কথাটা মনে পড়ে গেল | বড় গর্ব হল বাঙালিদের জন্য | তথাগতের ভাবনাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি | বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী তথাগত বারবার ফিরে আসেন এই পৃথিবীতে | জাতিস্মর থেকে জাতিস্মরে ছড়িয়ে যেতে যেতে তথাগত একটা গোটা জাতির স্বর হয়ে গেছেন |
উত্তর সিকিমের চোলামু হ্রদ থেকে বেরিয়েছে ত্রিস্রোতা বা তিস্তা | কালিম্পঙের কাছে রেলি, রিয়াং ও নানা রকম খোলা এসে মিশেছে তিস্তায় | তিস্তাবাজারের কাছে এসে মিশেছে রঙ্গীত | ডেলোর দিকে উঠতে উঠতে আমার গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল একটা ভিউ পয়েন্টে | এখন থেকে তিস্তা আর রেলিখোলার মিলন দেখা যায় | তিস্তা এমনিতেই বড় সুন্দরী | সাথে রেলি এসে মিশলে ব্যাপারটা আরও রোম্যান্টিক হয়ে যায় | ভিউ পয়েন্টের উপরে উঠে দেখলাম দারুন সুন্দর একটা যীশুর ক্রস | তার নীচে দুই প্রেমী | কলকলানো হাসি | তিস্তা-রেলির মিলনের মতই সুন্দর | ভিউ পয়েন্ট থেকে সামনে এগোতে এগোতে আকাশে রং-বাহারি পাখির মত কিছু জিনিস চোখে পড়ল | ভাল করে দেখে বুঝলাম প্যারা-গ্লাইডিং হচ্ছে | ছাতার মত পাল লাগানো গ্লাইডার | তাতে কেউ একা বা দোকা ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে | ডেলোর গেটের বাইরে বেশ কিছু সংস্থা অফিস খুলে বসে আছে প্যারা-গ্লাইডিংয়ের জন্যে | একা করলে একা | চাইলে সাথে ট্রেনার | সঙ্গে পুরো ব্যাপারটার ভিডিও | প্রায় ২০-৩০ মিনিট | হাঁটতে হাঁটতে ডেলোর বাংলোয় উঠে এলাম | চমৎকার সাজানো পরিবেশ | ফুলে ভরা বাগিচা | এখানে একটা জলাধার আছে | ডেলো কালিম্পঙের সবচেয়ে উঁচু জায়গা | চাইলে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায় বাংলোর লনে |
এরপর নামতে নামতে গ্রাহামস হোমের রাস্তা ধরলাম | স্কটিশ সাহেব ডক্টর জেমস এন্ডারসন গ্রাহাম কালিম্পঙ পাহাড়ে এসে একটা হোম বানান | এখানে বাচ্চাদের স্কুল আছে | পড়াশোনা ছাড়াও নানারকম হাতের কাজের ট্রেনিং দেওয়া হয় | ১৯৩০ সালে তৈরি এই গ্রাহামস হোম | মন ভালো করা জায়গা | শুনেছি ডক্টর গ্রাহামসের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা হত কালিম্পঙ এসে | মোটরস্ট্যান্ডে ফিরে দুপুরের খাওয়াটা সেরে ফেললাম | বলে রাখা দরকার স্ট্যান্ডের ঠিক উল্টো দিকে মিতজু হোটেল আর মেন রোড থেকে ডানদিকে এগিয়ে লি’জ-এ খাওয়াটা জরুরী | মেন রোডের ঘড়ি মোড়ের পাশেই গমপু’জ বার ও রেস্তোরাঁ | কালিম্পঙের সবথেকে পুরনো খানা-পিনার থেকে | মিতজু আর লি’জ-এ অসাধারন চিকেন ফ্রায়েড রাইস বানায় |
দুপুরের পর চললাম স্হানীয় হাট-বাজারে | খুব প্রসিদ্ধ এই কালিম্পঙের রাজা দোর্জে হাট | নানারকম পণ্যের প্রদর্শন ও বিক্রি | ফল থেকে ব্যাগ পর্যন্ত | দোকানিরা নিজেদের পরিবারের লোকজনদের নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন | কালিম্পঙ ভ্রমণে এই হাট-বাজার অবশ্যই ঘুরে যাওয়া উচিত | স্হানীয় পসরার স্বাদ পাওয়া যায় আর আলাপ হয় স্হানীয় মানুষ-জনের সাথে | সন্ধেটা কেটে গেল বিভিন্ন প্রাচীন জিনিসের দোকানগুলোতে | এই কিউরিও শপগুলোতে নানারকম থ্যাংক, ফটোগ্রাফ, ধাতুর মূর্তি ইত্যাদি পাওয়া যায় | ছোট চোর্তেন ও তিব্বতি বাদ্যযন্ত্র পর্যন্ত মেলে | মেন রোডের রেনু প্রধানের দোকান থেকে স্হানীয় আচার কিনলাম | কচি বাঁশের আচার |
পরদিন ছিল রবিবার | মোটর-স্ট্যান্ড থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম | একটু এগিয়ে পাহাড়ি পথ উঠে গেছে উপরে | আমিও উঠতে থাকলাম | গন্তব্য ম্যাকফারলেন চার্চ | পুরনো ও বিখ্যাত এই চার্চ রেভারেন্ড ম্যাকফারলেনের তৈরি | স্হাপত্য শিল্পের বিচারে অতুলনীয় | রবিবার সকালের মাস-এ খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম | বড় ভাল লাগল |
কিছুক্ষন পরে যখন শিলিগুড়ির বাস ধরে নামছি তখন মাথার মধ্যে সবকিছু কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে | ব্রিটিশ, রবীন্দ্রনাথ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, পুরনো বাংলো, প্যারা-গ্লাইডিং আর নানারকমের মরশুমি ফুলের এই শহরে আগে একবার এসেছিলাম | সেই টানে আবার এলাম | বাস পাকদন্ডী বেয়ে নামতে নামতে মন আপনা থেকেই বলে উঠল, আমি আবার আসব কালিম্পঙ, তুমি এমনই থেকো | আমি আবার আসব |
IMG_4733_FotorIMG_4744_FotorIMG_4750_FotorIMG_4752_FotorIMG_4772_FotorIMG_4786_FotorIMG_4789_FotorIMG_4793_FotorIMG_4801_FotorIMG_4803_FotorIMG_4833_FotorIMG_4847_FotorIMG_4868_FotorIMG_4874_FotorIMG_4882_FotorIMG_4893_FotorIMG_4895_FotorIMG_4910_FotorIMG_4917_FotorIMG_4929_FotorIMG_4944_FotorIMG_4953_FotorIMG_4959_FotorIMG_4966_FotorIMG_4975_FotorIMG_4976_FotorIMG_4982_FotorIMG_5010_FotorIMG_5013_FotorIMG_5035_FotorIMG_5052_FotorIMG_5075_Fotor
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s